গত ১ জুন, শুক্রবার পবিত্র জুমার দিনে বাংলাদেশের সবচেয়ে সংরক্ষিত এলাকা গুলশানের কুটনৈতিক জোনের ৭৯ নং রোডে হলি আর্টিজান নামক স্প্যানিশ রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ও জিম্মি করার যে ঘটনা ঘটলো তা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মানুষের উপর, জাতীয় অর্থনীতির উপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গুলশানের এই জায়গায় সাধারন আমজনতা যেতে পারেনা। যারা যান, তারা বিদেশী কিংবা সমাজের প্রভাবশালী-বিত্তশালী গোষ্ঠীর মানুষ। দু-চারটা পুলিশ চেকপোস্ট পার না হয়ে ঐ জায়গায় পৌছানো যায়না। সেরকম একটি জায়গায় যখন এই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হয়, তখন ধরে নিতে হবে বাংলাদেশে আর কোন জায়গাই আসলে নিরাপদ নয় এখন।

আমাদের দলীয় মানসিকতার নিরাপত্তা বিশ্লেষক কিংবা টকশোতে অংশ নেয়া তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা এতদিন এই ধরনের সন্ত্রাস বা জংগী হামলার জন্য একচাপা জামায়াত-শিবির আর মদদ দেয়ার জন্য বিএনপিকে অভিযুক্ত করে আসছিলেন। পাশাপাশি মাদ্রাসাকে জংগী প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে আখ্যায়িত করে এই সব অপকর্মের ষোলআনা দায় মাদ্রাসা ছাত্রদের উপর চাপাচ্ছিলেন। এবারও প্রথম দিন সেই নোংরা প্রচারনাই দেখেছি আমি। তবে দ্বিতীয় দিন থেকে যেভাবে সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করলো, তা আমাদের সকলের গতানুগতিক ধারনা বা হিসেব নিকেষকে পাল্টে দেবে- তাতে কোন সন্দেহ নেই।

যেই ৫ জংগীকে হত্যা করার দাবী করা হলো, তাদের একজনের সাথেও কিংবা তাদের পরিবারের সাথে জামায়াত-শিবিরের কোন সম্পর্ক নেই। তারা পার্টি-ফাংশন অভ্যস্ত কম্যুনিটির সন্তান। তাদের পিতারা সমাজের অত্যন্ত বিত্তশালী ব্যবসায়ী। অভাবের তাড়নায় তারা জংগী হয়েছে বলার কোন সুযোগ নেই। এই সব জংগীদের একজনেরও মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। তারা সকলেই স্কলাসটিকা, তার্কিশ হোপ বা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ইংরেজী মাধ্যমের ছাত্র। তাদের পূর্বের যেসব ছবি এখন পাওয়া যাচ্ছে তার সবই সংস্কৃতি বা ব্যবসাজগতের শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে তোলা। সুতরাং দালাল বুদ্ধিজীবিদের একচোখা ইসলাম বিরোধী এ্যানালাইসিসে এবার পরিবর্তন হবে আশা করি। পরিস্থিতি আমাদের ধারনার চেয়েও ভয়াবহ। কোন পর্যায়ের পরিবারের সন্তানেরা এমন মানসিকতার হয়ে গেল- এই বিষয়টা একটু চোখ বন্ধ করে ভাবলে শরীর শীতল হয়ে যায়।

টাকা বা অন্য কোন লোভে এদের ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে- এই ধরনের মন্তব্য আমার মনে হয় কোন পাগলও বিশ্বাস করবেনা। কারন তারা সবাই সোনার চামচ মুখে নিয়েই জম্মেছে এবং তাদের চলাফেরাও খুব সাধারন মানুষদের সাথে আগাগোড়া কখনোই ছিলনা। আরেকটি বিষয় হলো, জিম্মি ঘটনার অবসান হওয়ার পর এখন জানা যাচ্ছে ৫ সন্ত্রাসীর সবাই নাকি বেশ অনেকদিন ধরেই নিখোঁজ। কেউ ৬ মাস ধরে, কেউ বা ৩ মাস ধরে নিখোঁজ। তাদের পরিবারের লোকেরাও তাদের কোন সন্ধান এই সময়ে পাননি। কারও কারও নামে আবার থানায় নিখোঁজ হিসেবে জিডিও আছে। এই ছেলেগুলো এই সময় কোথায় ছিল, তাদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ কিভাবে তৈরী হলো, এগুলো আদৌ কোনদিন জানা যাবে কিনা জানিনা। তবে এই ঘটনা বাংলাদেশের যে কোন পরিবারের জন্যই মারাত্মক আশংকার জন্ম দিয়ে গেল।

এবার ভিন্ন কিছু বিষয়ের উপর একটু আলোকপাত করা যাক। ঘটনাটি যখন চলছে, সেই রাতে ১০টার দিকে ভারতের এনডিটিভি জানালো যে ঢাকার গুলশানে সন্ত্রাসী হামলায় দুজন ইতালিয় কুটনৈতিক মারা গেছে। যতদূর মনে পড়ে ততক্ষনে বাংলাদেশের টিভিগুলো সরকারের নির্দেশে লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের দেশের কোন চ্যানেল তখনও একজন মানুষের হত্যার খবরও দেয়নি। বরং তারা জানতেই পারছিল না যে ভেতরে কয়জন আটকা পড়েছেন বা তাদের মধ্যে আদৌ কোন বিদেশী আছেন কিনা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের কোন চ্যানেলের আগে ভারত কিভাবে জানলো? আর এরপর থেকে অব্যহতভাবে যখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাংলাদেশে আসার ব্যপারটি বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার বার আসতে থাকে, তখন ভারতের এহেন ভুমিকার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়।

ঘটনার দিন রাতেই আইএস’র সাইট ইন্টেলিজেন্স জানালো ২০ জন জিম্মিকে ইতোমধ্যেই হত্যা করা হয়েছে। আমাদের কোন মিডিয়া বা আইন শৃংখলা বাহিনীর কোন সোর্স তা নিশ্চিত করতে পারেনি। সকালে সেনাবাহিনী কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে যখন এই ঘটনার সমাপ্তি ঘটালো তারপর দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের মূল সমন্বয়ক জানান, ২০ জন জিম্মি এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তারা ২০টি লাশ পেয়েছেন যাদেরকে রাতেই হত্যা করা হয়েছে। তার মানে আইএস’র সাইট ইন্টেলিজেন্স রাতে যা দাবী করেছিল তাই সঠিক বলে প্রমানীত হলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা জানলো কিভাবে?

শুধু তাই নয়, হামলাকারী সবার ছবি আমাদের দেশের যে কোন আইন শৃংখলা বাহিনীর আগে তারা প্রকাশ করলো। শনিবার সকালেই ফেসবুকে ঐ রেস্টুরেন্টের হামলার বিভিন্ন ছবি এবং উপুড় হয়ে থাকা লাশের ছবি দেখতে পেলাম। এই ছবিগুলো বাংলাদেশর পুলিশ সরবরাহ করেনি। এগুলো নাকি আইএস’র সাইট ইন্টেলিজেন্স থেকেই পাওয়া গেছে। তারা এই ছবিগুলো পেল কোথায়? তার মানে হামলাকারীরা একের পর এক হত্যা করে এই ছবিগুলো আপলোড করে তাদেরকে পাঠিয়েছে। এর বাইরে কোন কিছু তো ধারনা করার সুযোগ নাই। এর মাধ্যমে এটাই বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার যতই অস্বীকার করুক, বাইরের কোন ফোর্সের সাথেও হামলাকারীদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া ভিন্ন একটি খবরে এটাও জানা গেছে যে, হামলাকারীরা হোটেলের ওয়াইফাই বা ইন্টারনেট কানেকশন চালু রাখার জন্য বারবার হোটেল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিল। সুতরাং ধারনা করে নেয়া যায় যে, ইন্টারনেটের মাধ্যমেই তাদের কর্মকান্ডের যাবতীয় আপডেট জানানো হতো।

এই ঘটনার পর বিভিন্ন মিডিয়ায় যেসব বিশ্লেষন আমি শুনলাম, তাতে মনে হলো, আমাদের অধিকাংশ পর্যাবেক্ষকদের মাথায় এখনও গতানুগতিক চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতা এবং দালাল বুদ্ধিজীবিরা এই ঘটনার জন্য বরাবরের মতই বিএনপি-জামায়াতকেই দায়ী করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার চেষ্টা করলো।

জামায়াত কিন্তু এই ঘটনায় সবার আগে নিন্দা জানিয়েছে। সন্ত্রাসী হামলা থেকে দেশের হেফাজত কামনা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্যেও দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছে। যদিও মেইনস্ট্রীম মিডিয়া বিষয়টা এভয়েড করে গিয়েছে বরাবরের মতই। আর বিএনপি তাদের প্রতিক্রিয়া জানালো ৩ তারিখ, রোববার স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে। সেদিন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সন্ত্রাস বিরোধী জাতীয় ঐক্য গঠনেরও ডাক দিলেন। আমার মতে সেদিনের ভাষন ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার বেস্ট ভাষন। অথচ সেই বক্তব্যের আধাঘন্টার মধ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, বিএনপির ঐক্যের আহবানকে খারিজ করে দেন।

৩ তারিখ দিবাগত রাতে বাংলাভিশন চ্যানেলের নিউজ এন্ড ভিউজ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সন্ত্রাস প্রসংগে তার কথাকে খুবই গুরুত্বের সংগে নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কেননা তিনি নিজেই একজন ভিকটিম। তার একমাত্র ছেলে, জাগৃতি প্রকাশনীর কর্নধার ফয়সল আরেফীন দীপনকে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জংগীরা কুপিয়ে হত্যা করে।

সেদিনের সেই টকশোতে গুলশান হামলা প্রসংগে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, যদি আওয়ামী লীগের দাবী অনুযায়ী জামায়াত বা বিএনপি এই সব ঘটনার জন্য দায়ী হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করে সরকার কেন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা? কোন ব্যবস্থাও নিবেনা, আবার কিছু হলেই এই দুইদলকে দায়ী করে দায় চাপাবে- এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে আসলে আওয়ামী লীগ এগুলো করছে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য। গুলশানের এত বড় ঘটনার পর আওয়ামী লীগের বোধোদয় হওয়া উচিত, তাদের নেতাদের বাকসংযমী হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নামে জাতিকে বিভক্ত করে রেখেছে। যেসব কথা বলে তারা এই বিভাজনটা তৈরী করেছে তা একটা মিথ্যা গল্প, রং মেটাফোর। বিএনপির ব্যর্থতা হলো তারা এই মিথ্যা গল্পের বিরুদ্ধে কাউন্টার সত্যটা জাতিকে জানাতে পারছেনা। তিনি সব ধরনের বিভাজন ও বিভক্তিকে পাশ কাটিয়ে জাতির স্বার্থে অবিলম্বে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি সকল দলের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা প্রদর্শনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রতি আহবান জানান।

টকশোতে অংশ নিয়ে সাবেক কেবিনেট সচিব ড. সাদত হোসেন বলেন, যদি তামিলদের হাজার হাজার মানুষের হত্যার পরও শ্রীলংকা সরকার তাদের সাথে আলোচনা করতে পারে, যদি তালেবানদের সাথে দফায় দফায় পশ্চিমা বিশ্বের আলোচনা হতে পারে, তাহলে বিএনপি-জামায়াতের সাথে কেন আওয়ামী লীগের আলোচনা বা বৈঠক হবেনা? বিএনপি-জামায়াত তো তামিল বা তালেবানদের মত নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রবীন দল এবং তারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। জাতির এই চরম সংকটেও তাদেরকেই আগে জাতীয় ঐক্য গড়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। 

অন্যদিকে, অন্য চ্যানেলগুলোতেও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যে দেখছি, আওয়ামী লীগ নেতারা এবং বুদ্ধিজীবীরা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ সুন্দর করেই ঐক্য গড়ার কথা বলছেন। তবে তা জামায়াত-বিএনপিকে বাদ দিয়ে। অবাক লাগে, সিভিল সোসাইটি এবং সমাজের চিন্তাশীল মানুষগুলো এবং সর্বোপরি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাবনার সাথে আওয়ামী লীগের কৌশলের কত ফারাক। বিএনপি-জামায়াতকে যদি বাদই দেয়া হয়, তাহলে সেই ঐক্যতো আছেই। যার নাম মহাজোট। সেই জোটে জাসদ, ওয়ার্কাস পার্টিসহ অনেকেই আছে। তারা ক্ষমতায়ও আছেন কিন্তু সমস্যার সমাধান তো করতে পারছেন না।

সুতরাং দেশের স্বার্থে আওয়ামী লীগের উচিত চেনাজানা রাজনৈতিক গন্ডির বাইরে বেরিয়ে আসা। আমি মনে করি, শুধু বিএনপি-জামায়াত নয়, বরং বাংলাদেশের সকল পেশাজীবী, সকল মতের সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যমে একটি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবী। কেননা কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্যেগ নয় বরং একটি সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া এই ক্রমবর্ধমান সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

আর কোন গনতান্ত্রিক শক্তিকে নিষিদ্ধ করাও কোন সমাধান নয়। বরং জাতীয় ঐক্যের পাশাপাশি আমাদের চেষ্টা চালাতে হবে যাতে অধিকাংশ দল বা গোষ্ঠীকেই মূলধারার রাজনীতির আওতায় রাখা যায়। জাতির এই ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগ সেই দূরদর্শিতা দেখাবে নাকি নিজেদের নিপীড়নমূলক সংকীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা অব্যাহত রাখবে, এখন তাই দেখার বিষয়।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।)

কেবি