যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৩০ লাখ মুসলিম বাস করছেন। মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে সে দেশে। যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদ নির্মাণের চাহিদাও বাড়ছে। তবে গত ছয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের বিরোধিতা জোরদার হতে দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে তীব্র কটূক্তির মাধ্যমে তারা তাদের বিরোধিতা প্রকাশ করছে।
কানাডার বৃহত্তম দৈনিক সংবাদপত্র ‘টরন্টো স্টার’ ২৫ আগস্ট, ২০১৬ সংখ্যায় ‘যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদ স্থাপনের বিরুদ্ধে ক্রোধ প্রকাশ’ হেডলাইন দিয়ে পূর্ণপৃষ্ঠার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম মসজিদ স্থাপনের পর থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে একে একে মসজিদ স্থাপিত হয়েছে। স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীরা কোনো বিরোধিতা করেনি এর। তবে ছয় বছর আগে ম্যানহাটনের ‘গ্রাউন্ড জিরো’- যেখানে ৯/১১ এর ভয়াবহতম ধ্বংসকাণ্ড ঘটেছিল, সেখান থেকে দুই ব্লক দূরে একটি ইসলামিক সেন্টার স্থাপনের প্রস্তুতি শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের মধ্যে দারুণ রোষ সৃষ্টি করে। দক্ষিণপন্থী সংবাদপত্রগুলো এটাকে উসকে দেয়।
নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ ইসলামিক সেন্টার তথা মসজিদ নির্মাণের প্রকল্পটি সমর্থন করেছেন।
তা সত্ত্বেও শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে ২০১১ সালে প্রকল্পটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
ফেডারেল বিচারপতি অনুমতি দিলেন
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেশি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিল এলাকায় ২০১০ সালে একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলে মুসলিমবিদ্বেষী স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দারা অনুমতি প্রদানকারী কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষেপে যায়। তারা মসজিদ নির্মাণ বন্ধ করার জন্য মামলা দায়ের করে।
এমনকি মসজিদ নির্মাণের স্থানে এক ব্যক্তি অগ্নিসংযোগ করে। সেখানে বোমা হামলার হুমকি দেয়ার কারণে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। অঙ্গরাজ্যের লেফটেন্যান্ট-গভর্নর বলেন, ‘ইসলামকে এক ধরনের অপসংস্কৃতি বলে বিবেচনা করা উচিত’।
কিন্তু চূড়ান্তপর্যায়ে একজন ফেডারেল বিচারপতি ২০১২ সালে মসজিদটি চালু করার অনুমতি দিলেন।
মিশিগান অঙ্গরাজ্যের স্টার্লিং হাইটস শহরে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব শহরের প্লানিং বোর্ড গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শহরটির অফিসিয়াল পরিকল্পনাকারী ‘মসজিদটির অবস্থান পারিপার্শ্বিকতার সাথে বেমানান হবে’ মর্মে অভিমত দেয়ায় প্রস্তাবটি ৯-০ ভোটে বাতিল হয়ে যায়।
মসজিদটি নির্মাণের প্রচণ্ড বিরোধিতা করে খ্রিষ্টান ধর্মের ইরাকি-আমেরিকান স্থানীয় জনগোষ্ঠী। তাদের অনেকেই মুসলিমবিরোধী মনোভাব প্রকাশ করেছে। বিরোধটি নিয়ে একটি মোকদ্দমা দায়ের হয়েছে এবং বিচার দফতর তদন্ত করছে এ বিষয়ে।
নিউ জার্সির বার্নাডস শহরের মুসলিম অধিবাসীদের একটি গ্রুপ ওই শহরের একজন সাবেক মেয়রের নেতৃত্বে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব পেশ করলে নিউ ইয়র্ক নগরীর শহরতলি এলাকার ধনী শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীরা তা নাকচ করার জন্য ভোট দেয়। শহরের বর্তমান মেয়র যদিও এ অজুহাত দেখান যে, ‘জমির সদ্ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তাবটি নাকচ করা হয়েছে’, মসজিদ নির্মাণের পক্ষের গ্রুপ মামলা করেছে এবং বিচার বিভাগ নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে।
টরন্টো স্টার’-এর প্রতিবেদনে এক বাংলাদেশী-আমেরিকানের সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টার বিবরণ দেয়া হয়েছে। মোহাম্মদ ইসমাঈল একজন মিষ্টভাষী ব্যক্তি। তিনি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসে আটলান্টায় বসবাস শুরু করেন।
তার দুই সন্তানই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছে। তিনি অদূরে ডিকালব কাউন্টিতে একটি মসজিদ স্থাপন করেছেন। তার পাশের বাড়ির প্রতিবেশী টম ওয়েলস মসজিদটি স্থাপনের প্রচণ্ড বিরোধিতাকারী রক্ষণশীল আমেরিকান। সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাৎকারে ওয়েলস বলেন, ‘আমি ইমামকে (মোহাম্মদ ইসমাইলকে) ভালোবাসি। আমরা পরস্পরকে পছন্দ করি।’
ডিকালব কাউন্টিতে প্রতিষ্ঠিত এ মসজিদটিতে শুক্রবারে দুই থেকে তিন শ’ মুসলিম নামাজ আদায় করেন। তাদের বেশির ভাগ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত বাংলাদেশী। অদূরবর্তী নিউটন কাউন্টিতে একটি মসজিদ নির্মাণের ব্যাপারে স্থানীয় খ্রিষ্টান অধিবাসীদের প্রচণ্ড বিরোধিতা প্রকাশ পাচ্ছে।
মোহাম্মদ ইসমাঈল বলেন যে, নিউটন কাউন্টির প্রায় এক লাখ অধিবাসীর মধ্যে অনেকেই মসজিদটি স্থাপন সমর্থন করেন। তিনি বলেন, মসজিদটির অবস্থান সড়কের এক পাশে অবস্থিত ব্যাপটিস্ট গির্জা এবং কবরস্থানের বিপরীত দিকে। তিনি বলেন, মসজিদটির প্রধান ব্যবহার হবে মুসলমানের লাশ ধোয়া ও কাফন-দাফন দেয়ার ব্যবস্থা করার জন্য। এখন মৃত মুসলমানকে বহু অর্থব্যয়ে অমুসলিম ফিউনারেল হোমে কাফন-দাফনের জন্য প্রস্তুত করতে হয় এবং অর্থব্যয় করে গাড়িতে বহন করে কবরস্থানে নিয়ে যেতে হয়।
তিনি আরো বলেন, শুধু কোনো মুসলিম মারা গেলে তার শেষকৃত্যের জন্য মসজিদটি অল্প সময় ব্যবহার করা হবে। অন্য সময়ে মসজিদটি বন্ধ রাখা হবে। কিন্তু তার এ ব্যাখ্যায়ও মসজিদ নির্মাণের ঘোরতর বিরোধিতাকারীরা কর্ণপাত করেনি।
এসএ





