শনিবার দুপুর ২টায় রাজধানীর রমনায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন থেকে এসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রকাশনা ও প্রচারণা বন্ধের দাবিতে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, সরকার দাবি মেনে না নিলে রাজধানীর মহাসমাবেশ থেকে ঢাকা অচল বা অবরোধ এবং জাতীয় সংসদ ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—কাদিয়ানী মতবাদের বিষয়ে সংগঠনের বক্তব্য তুলে ধরে আকিদায়ে খতমে নবুওয়তবিষয়ক বই-পুস্তক দেশের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকদের কাছে দেওয়া; আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় ধারাবাহিকভাবে খতমে নবুওয়ত সমাবেশ করা; আট বিভাগে পর্যায়ক্রমে মহাসমাবেশ আয়োজন; প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং রাজধানীতে আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসমাবেশ করা।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জামে মসজিদে জুমার বয়ানে ‘আকিদায়ে খতমে নবুওয়ত’ বিষয়ে আলোচনা এবং মুসল্লিদের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

সম্মেলনে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ ঘোষণা, মুসলমানদের ধর্মীয় পরিভাষা ও উপাসনালয় ব্যবহারের বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ এবং তাদের বই, লিটারেচার, ম্যাগাজিন, ডিজিটাল কনটেন্ট ও প্রচারণামূলক উপাদান নিষিদ্ধ করার দাবি রয়েছে।

এ ছাড়া কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বন্ধ, ইসলাম ও ইসলামের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও গ্রন্থের অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন, মুসলমানদের সঙ্গে কাদিয়ানীদের বিবাহ এবং মুসলিম কবরস্থানে তাদের মৃতদের দাফন নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।

দাবির মধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রমে ‘খতমে নবুওয়ত’-সংক্রান্ত আকিদার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে তাদের ধর্মীয় পরিচয় ‘কাদিয়ানী’ হিসেবে উল্লেখ করার প্রস্তাবও রয়েছে।

এ ছাড়া কাদিয়ানীদের পৃষ্ঠপোষক বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএলকে দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ইজারা প্রত্যাহার, মাওলানা সা’দকে বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং সা’দপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে হিজবুত তওহীদকে নিষিদ্ধ করে তাদের প্রচার ও প্রকাশনা বন্ধের দাবিও রয়েছে।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ্ বাবুনগরী। তাঁর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের নির্বাহী সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব।

লিখিত বক্তব্যে তিনটি দাবির কথা তুলে ধরা হয়—কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে সংসদে আইন পাস করে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ ঘোষণা, মুসলমানদের ব্যবহৃত ধর্মীয় পরিভাষা ও উপাসনালয় ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের বই-পুস্তক, ওয়েবসাইট ও প্রচারমূলক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।

মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে একাধিকবার কাদিয়ানীদের নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে তা বাস্তবায়ন করছে না।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল ধর্মমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের। অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। তাঁর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী। বক্তব্যে সম্মেলন থেকে উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করার কথা বলা হয়।

বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি জাতীয় সংসদে কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার বিল উত্থাপনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলে ‘তৌহিদী জনতা’ সমুচিত জবাব দেবে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকও সংসদে বিল উত্থাপনের দাবি জানান। তিনি বলেন, দাবি বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত না হলে আগামী নভেম্বরে সংসদ ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক বলেন, কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের কার্যক্রম নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে তিনি সরকারের প্রতি প্রশ্ন তোলেন।

সম্মেলনের সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের সভাপতি ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান সম্মেলনে অংশ নেওয়া আলেম-উলামা, মাশায়েখ ও উপস্থিত জনতাকে ধন্যবাদ জানান।

তিনি খতমে নবুওয়তের আকিদা সংরক্ষণের দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোতে ব্যাপক অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আজহারী, মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম কাসেমী ও মাওলানা এনামুল হক মুসার সঞ্চালনায় সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা খলিল আহমাদ কুরাইশী, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী, মাওলানা আব্দুল আওয়াল, মুফতি জসিম উদ্দীন হাটহাজারী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, মাওলানা একরাম হোসাইন পাটিয়া, মুফতি কিফায়াতুল্লাহ হাটহাজারী, মাওলানা মামুনুল হক, ড. আহমদ আব্দুল কাদের, মুফতি মুবারকুল্লাহ বি-বাড়িয়া, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মাওলানা আবদুল বাসিত খান, মুফতি বশীরুল্লাহ, মাওলানা শাব্বির আহমাদ রশিদ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী, মাওলানা বাহাউদ্দিন বাকারিয়া, মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমী, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, মুফতি উবায়দুল্লাহ, মাওলানা জহুরুল ইসলাম, মাওলানা আনাস ভোলা, মাওলানা শওকত হোসেন সরকার, মাওলানা মাসউদুল করীম, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ এমপি, মাওলানা মীর ইদ্রিস, মাওলানা ইউনুস ঢালী ও মাওলানা আব্দুল্লাহ ইয়াহইয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আলেম ও নেতারা।

এমএম