তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘোষণার পেছনে শুধু নির্বাচনি সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়াই নয়, জোটের ভেতরে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও মূল্যায়ন নিয়ে ক্ষোভও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে জোট থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুল হাফিজ খসরুর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১১ দলীয় ঐক্য মূলত জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গঠিত হয়েছিল। নির্বাচন শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন থেকে জোটের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবে না খেলাফত মজলিস। তবে দেশ, জাতি ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে নতুন করে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
দলের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটি এখন আর কার্যকর নেই। গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ কয়েকটি বিষয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে মতের মিল থাকলেও খেলাফত মজলিস সেসব ইস্যুতে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে।
খেলাফত মজলিস জানিয়েছে, জোট থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামে ১১ দলীয় বিভাগীয় সমাবেশের পরই তারা জোটকে জানিয়ে দেয়, ভবিষ্যতে কোনো ব্যানার, পোস্টার বা প্রচারণায় তাদের দল বা নেতাদের নাম ব্যবহার না করতে। পরে রংপুরের একটি সমাবেশে নাম ব্যবহার করা হলে আপত্তির পর তা প্রত্যাহার করা হয়।
সর্বশেষ সিলেট বিভাগীয় সমাবেশেও খেলাফত মজলিস অংশ নেয়নি। একই দিনে ঢাকায় দলের কেন্দ্রীয় শূরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় শীর্ষ নেতারা সিলেটে যাননি। এর আগে সিলেট জেলা সভাপতি মাওলানা নেহাল আহমদও জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় শূরার বৈঠকেই ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা না-থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
দলের একাধিক সূত্রের দাবি, জোটের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছিল খেলাফত মজলিস। দলটির মূল ক্ষোভ মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ওপর। প্রায় ২০ বছর আগে ভেঙে দুটি দল হলেও নির্বাচনের আগের বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে তারা ১১ দলীয় ঐক্যে গিয়েছিল। তবে সেখানে জামায়াত বরাবরই মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
খেলাফত মজলিসের দাবি, মামুনুল হকের রাজনীতির সূচনা খেলাফত মজলিসের নেতাদের হাতে। তিনি অনেক পরে রাজনীতিতে এসেছেন। ড. আহমদ আবদুল কাদেরসহ এই দলে অনেক বর্ষীয়ান নেতা থাকলেও তাদের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় মাওলানা মামুনুল হককে। এমনকি মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে ততটা শক্তিশালী না হওয়ার পরও মামুনুল হকের দলকে গত নির্বাচনে বেশি আসনে ছাড় দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন খেলাফত মজলিস নেতারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে থেকেই একটি ইসলামি দল ও তার নেতৃত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আসন বণ্টনেও খেলাফত মজলিস বৈষম্যের শিকার হয়েছে। সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় অন্য একটি দল বেশি আসন পেয়েছে এবং নির্বাচনের পরও সেই বৈষম্য অব্যাহত ছিল। ফলে তৃণমূল থেকেও জোট ছেড়ে স্বতন্ত্রভাবে সংগঠন পরিচালনার চাপ বাড়তে থাকে।
এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে জোট ভাঙার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আগে পাওয়া যায়নি। এর আগে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও ঘোষণা দিয়ে ১১ দল ছেড়েছে।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল খেলাফত মজলিস। তবে ২০২১ সালের শেষ দিকে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে বিএনপি জোট ছাড়ে। তখনও দলটি বিএনপির প্রতি অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলেছিল।
এমএম