আগামীকাল ১৮ জুলাই শনিবার পালিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। নতুন পোশাক, ঈদের আনন্দে ভেসে যাবে সারা দেশ।

আরেক বাস্তবও অনেক বেশি সত্য। ঈদ দুয়ারে অপেক্ষা করলেও অগুণতি ঘরে নেই পরিবারের বাবা বা ছেলেটি। মাসের পর মাস ধরে কেউ আছেন জেলখানায়, কেউ বা ফেরার, কেউ বা সত্যি গুমই হয়ে গেছেন।

হ্যা, এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দে শামিল হতে পারছেন না বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের মিত্র জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরা পর্যন্ত।

গত প্রায় আট বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও কারাগারে ঈদ কাটবে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরে ও শিল্প উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর। গত বছরের মতো এবারও কারাগারে ঈদ কাটাতে হচ্ছে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

মুক্তি না পাওয়ায় কারাগারে ঈদ করবেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মিজানুর রহমান মিনু, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বরখাস্তকৃত মেয়র আবদুল মান্নান, সিলেটের বরখাস্তকৃত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, রাজশাহীর বিএনপি নেতা নাদিম মোস্তফা, নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদ।

কেন্দ্রীয় এই নেতাদের ছাড়াও সারা দেশের কারাগারগুলোতে জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কয়েক হাজার নেতাকর্মী কারাগারে আছেন। তাদেরও কারাগারে ঈদ করতে হবে।

এদিকে বিএনপির শরিক দল জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সিনিয়র নায়েবে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম, সাবেক শিবির সভাপতি মীর কাশেম আলী, শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ প্রায় সব জেলা ও থানার আমির ও সেক্রেটারিসহ অনেক নেতাকর্মীই কারাবন্দি থাকায় তাদের জেলখানাতেই ঈদ উদযাপন করতে হবে।

দশ লাখ বিরোধী নেতাকর্মীর নামে মামলা

আইনজীবীদের সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০১৩ সালের ও চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের সরকার বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সাত হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় দুই হাজার ও ঢাকার বাইরে পাঁচ হাজার।

এসব মামলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নামসহ অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয় অন্তত ১০ লাখ।

এই আসামিদের মধ্যে দশ হাজারের মত নেতাকর্মী কারাগারে বন্দি আছেন। বাকিদের মধ্যে কেউ কেউ জামিনে থাকলেও বেশির ভাগই কারাবরণের ভয়ে জামিনের জন্য আদালতেও যাননি। তারা মূলতঃ আত্মগোপনে থেকে ফেরারি জীবন যাপন করছেন।

এদিকে গত দুমাসে পুলিশি হয়রানি এড়াতে বিএনপি জামায়াতের প্রায় ৩০ হাজার নেতাকর্মী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি দলে যোগ দেয়ার পর মামলা থাকা সত্ত্বেও তারা নিজ বাড়িতে থাকার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছেন। তারা নির্বিঘ্নে ঈদ করতে পারলেও বিগত ছয় বছর বিরোধী দলে থাকার কারণে তারা অনেকই আর্থিকভাবে ভাল নেই। ফলে সদ্য সরকারি দলে গেলেও তাদের ঈদ আনন্দ অনেকটাই অনিশ্চিত।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগে যোগ না দেয়া বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই দলে দলে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, বগুড়া-গাইবান্ধাসহ উত্তরবঙ্গে ও চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার বরণ করছেন বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা।

মামলা, গ্রেপ্তার হওয়া বা সরকার দলীয় কর্মীদের হাতে মারধরের আতঙ্কে বিএনপি-জামায়াতের এই সব নেতাকর্মীরা নির্বিঘ্নে ঈদ উদযাপন করতে পারবেন না। আর তাদের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিরোধী পরিবারগুলোতেও হাহাকার বিরাজ করছে।

আত্মগোপণে বিএনপি নেতৃবৃন্দ

একাধিক রাজনৈতিক মামলার কারণে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ থানা পর্যায়ের নেতারাও আত্মগোপনে আছেন। তারা দিনের পর দিন নিজেদের বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন। কেউ আত্মগোপনে না থাকলেও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছেন না।

একাধিক মামলা আছে এমন বিএনপি নেতারা হলেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া (৫), মির্জা আব্বাস (৭৩), ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ (১০), এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী (৩), বিএনপির সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান (৫), বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান (তিন মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি), ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান (১০), খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান ওরফে শিমুল বিশ্বাস (৪৭), বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক (১০), ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি (৪০), যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলু (৫০), সহসভাপতি মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন (৫), আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম (৩), গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া (২), সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন (১১) ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন (৫), যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল (১১০) ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নীরব (১৭৮), স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল (১০০) ও সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু (১০৫), সহসাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম (৭), যুবদল ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) সভাপতি রফিকুল আলম মজনু (১০৬), যুবদল ঢাকা মহানগর (উত্তর) সাধারণ সম্পাদক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন (১৩৭), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ (৪৭), ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল (১০১) ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব (৯৮), বিএনপি নির্বাহী সদস্য বেলাল আহমেদ (৮), ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার (১৭), সাবেক কমিশনার আরিফুর রহমান (৫), মিরপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন দুলু (১২০),ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ কাইয়ুম (৩৮) ও খিলগাঁও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফারুক উল ইসলাম (১২)।

আত্মগোপনে জামায়াত নেতৃবৃন্দ

২০১০ সালে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী কারাবন্দি হওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পান মকবুল আহমাদ। তিনি সহ দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর ধরে আত্মগোপন হয়ে আছেন। তারা নিজেদের বাসাবাড়িতে থাকেন না এবং তাদের মোবাইল ফোন অনেকটা স্থায়ী ভাবেই বন্ধ।

এরকম জামায়াত নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, প্রচার সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনিম আলম, ঢাকা মহানগরের আমির রফিকুল ইসলাম খান ও সেক্রেটারি নুরুল ইসললাম বুলবুল, শিবিরের সাবেক সভাপতি সেলিম উদ্দিন, ড. রেজাউল করিম, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক প্রমুখ।

জানা গেছে, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে জামায়াতের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদেরও সব সময় গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়। আগে জামায়াত-শিবির চাপের মুখে থাকলেও চলতি রমজান থেকে ছাত্রী সংস্থা ও মহিলা জামায়াতের সদস্যরাও হয়রানির সারিতে চলে এসেছে।

এসএইচ