সরকারের ২বছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় দিয়েছে বিএনপি।
দলের পক্ষ বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গতকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষনে জাতি হতাশ হয়েছে।
গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।এসময় তার সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষন জাতিকে হতাশ করেছে। জাতি প্রত্যাশা করেছিল তার ভাষনে চলমান রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতা থেকে উত্তরনের জন্য কোনো দিক নির্দেশনা থাকবে। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) গতানুগতিক ও বাস্তবতা বিবর্জিত কথা বলেছেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরনের জন্য একটি মাত্র পথ খোলা রয়েছে। তা হল- বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করা।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল একটি প্রহসন। একটি রাবারস্ট্যাম্প পার্লামেন্ট গঠন ও ১২ জানুয়ারি একটি অদ্ভুত ধরনের সরকার গঠন করে দেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীকালে উপজেলা, সিটি করপোরেশন এবং সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, এই সরকারের অধীনে এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় কোনো নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না।’
সরকারের গত দুই বছরে বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং মতের ব্যক্তিদের ওপরে সীমাহীন নির্যাতন ও দমন পীড়ন হয়েছে বলে দাবি করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
“এই সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪৪০ জন, গুম ও নিখোঁজ হয়েছেন ২৬৭ জন, গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন ৩৩৭ জন। রাজনৈতিক মামলা হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৮৩, আসামির সংখ্যা ৪ লাখ ১৬ হাজার ৭৪৭ জন এবং গ্রেফতার ও জেলহাজতে গেছেন ১৭ হাজার ৮৮৫ জন।”
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তথাকথিত উন্নয়ন’র কথা বলে সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। এটা করতে গিয়ে একে একে রাষ্ট্রের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হয়েছে। সরকার গণতন্ত্রের মুখোশ পরে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই মন্তব্যের বিরোধিতা করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই বক্তব্য কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। গণমাধ্যম এই সময়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো কিছুই বলতে পারছে না। ভিন্ন মতের পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমার দেশসহ কয়েকটি পত্রিকা বন্ধ এবং চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টিভি, দিগন্ত টেলিভিশন বন্ধ হয়েছে। সহস্রাধিক সংবাদকর্মী কর্মচ্যুত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইটিভির মালিকানা জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান তিন বছর ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন। সাংবাদিক নেতা ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ দীর্ঘদিন কারাগারে আটক রয়েছেন। কারাগারে আটক রয়েছেন ইটিভির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম। এছাড়াও সারা দেশে অসংখ্য সংবাদকর্মী সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপি, নেতা এবং কর্মীদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন। গ্রেফতার হয়েছেন অনেকে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দাবি করেন, ‘দেশে এখন ভিন্ন মত পোষণকারী লেখকদের ভীতি ও জীবনের হুমকি দেওয়া হয়। অনেক সময় তুলে নিয়ে গিয়ে ভয় দেখানো হয়। সরকারের সমালোচনা করলে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশকে এখন তথাকথিত নিরাপত্তা রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে।’
বিএনপি-ই দেশে অর্থনীতির ভিত্তিই তৈরি করেছে এমন দাবি করে তিনি বলেন, ‘তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির সোপানে উন্নীত করেছে বিএনপি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সেই সংস্কার শুরু হয়েছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাতে প্রাণ সঞ্চার করেছেন এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।’
তিনি দাবি করেন, ‘সরকার সুপরিকল্পিতভাবে অর্থনীতিতে সীমাহীন লুণ্ঠনের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়েছে, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক ও ডেসটিনি কেলেংকারী; শেয়ারবাজার লুণ্ঠন, কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে জনগণের অর্থ লুট করা হয়েছে। এই সরকারের আমলে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। শুধু এই বছরে ৭৭ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অর্থনীতির উন্নয়নে যে কল্পকাহিনি সরকার প্রচার করছে, তার সত্যতা প্রকাশ হয়ে গেছে, সম্প্রতি সিপিডি, টিআইবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে। এতে দেখা গেছে, বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সীমাহীন দুর্নীতি ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্যে বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা ও হতাশ হয়ে পড়েছেন।’
বর্তমান সরকারের সময়ে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়েছে দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, কৃষিব্যবস্থা চরম হুমকির মধ্যে। কৃষকেরা কৃষি পণ্যের বিশেষ করে ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেনা। কৃষি উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে। কৃষকরা নিজস্ব পেশা ছেড়ে যাচ্ছে। সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা চরম নৈরাজ্যের মধ্যে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিক্ষাঙ্গণে ব্যাপক নকল প্রবণতা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বৈষম্যের মাধ্যমে সম্মানহানি করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান, যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, সহ-প্রচার সম্পাদক ইমরান সালেহ প্রিন্স, সহ-দফতর সম্পাদক আসাদুল করীম শাহিন, ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এজমল হোসেন পাইলট প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এমএইচ





