দুঃখজনকভাবে, এ দুটি বিষয়কে ঘিরে মুসলিম সমাজে কখনো কখনো বিভ্রান্তি, অতিরঞ্জন এবং বিভিন্ন অনৈসলামিক রীতিও দেখা যায়। তাই আশুরা ও কারবালার প্রকৃত তাৎপর্য জানা এবং এ বিষয়ে ভুল ধারণা থেকে দূরে থাকা জরুরি।

আশুরা: মুক্তি ও কৃতজ্ঞতার দিন

‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ (দশ) থেকে এসেছে। অর্থাৎ মহররমের ১০ তারিখ। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তিনি এর কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, এ দিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা অধিক নিকটবর্তী।’ এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ২০০৪; সহিহ মুসলিম: ১১৩০)

আশুরার রোজার ফজিলত

হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

কেন ৯ বা ১১ মহররম মিলিয়ে রোজা রাখা উত্তম?

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন সাহাবিরা বললেন যে ইহুদিরাও আশুরার দিনকে গুরুত্ব দেয়, তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)

এ কারণে ফুকাহায়ে কেরাম ৯-১০ অথবা ১০-১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখাকে উত্তম বলেছেন।

৬১ হিজরির ১০ মহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা। সেখানে নবী করিম (স.)-এর প্রিয় দৌহিত্র, হজরত আলী (রা.) ও ফাতিমা (রা.)-এর সন্তান ইমাম হোসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন।

তিনি অন্যায় ও জুলুমের কাছে মাথা নত না করে সত্যের পক্ষে অবিচল ছিলেন। কারবালার ঘটনা মুসলমানদের জন্য ধৈর্য, ত্যাগ, ঈমানি দৃঢ়তা এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার এক অনন্য শিক্ষা।

রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর নাতিদের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হাসান ও হোসাইন জান্নাতি যুবকদের নেতা।’ (জামে তিরমিজি: ৩৭৬৮)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘হোসাইন আমার অংশ এবং আমি হোসাইনের অংশ।’ (জামে তিরমিজি: ৩৭৭৫)

তাই ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের দাবি। তবে এ ভালোবাসা অবশ্যই কোরআন-সুন্নাহর সীমারেখার মধ্যে হতে হবে।

যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে

১. আশুরাকে শুধু কারবালার শোকের দিন মনে করা: অনেকে মনে করেন, আশুরা মানেই শুধু কারবালার ঘটনা। বাস্তবে আশুরার ধর্মীয় গুরুত্ব কারবালার বহু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে আশুরার রোজা রেখেছেন এবং এর ফজিলত বর্ণনা করেছেন।

২. শোক প্রকাশে সীমালঙ্ঘন: কিছু সমাজে আশুরা উপলক্ষে বুক চাপড়ানো, শরীরে আঘাত করা, রক্তাক্ত হওয়া বা মাতম করার রীতি দেখা যায়। অথচ ইসলামে নিজের শরীরের ক্ষতি করা বা অনৈসলামকি পদ্ধতিতে শোক প্রকাশের অনুমতি নেই। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গালে আঘাত করে, জামা ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের আহ্বান জানায়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১২৯৪; সহিহ মুসলিম: ১০৩)

৩. বিদআতি সংস্কৃতি: অনেক স্থানে তাজিয়া মিছিল, বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা কিংবা শরিয়তে প্রমাণিত নয় এমন রীতিকে ধর্মীয় আমল হিসেবে পালন করা হয়। অথচ ইবাদতের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর অনুসরণই মূলনীতি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)

৪. সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য: কারবালার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কোনো সাহাবি বা আহলে বাইতের মর্যাদাহানি করা বৈধ নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো- আমরা সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে বাইত উভয়ের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান পোষণ করি।

আশুরা ও কারবালার প্রকৃত শিক্ষা

আশুরা আমাদের শেখায় আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করতে, তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে এবং নবীদের আদর্শ অনুসরণ করতে। কারবালা আমাদের শেখায় সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও ঈমানের ওপর অটল থাকতে।

অতএব, আশুরা ও কারবালা উভয়ই মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে এ দিনকে ঘিরে আবেগের পাশাপাশি জ্ঞান ও প্রজ্ঞারও প্রয়োজন রয়েছে। একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, আশুরার রোজা ও অন্যান্য সুন্নাহ আমলের প্রতি যত্নশীল হওয়া, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা রাখা এবং একই সঙ্গে বিদআত, কুসংস্কার ও অতিরঞ্জন থেকে দূরে থাকা।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, জামে তিরমিজি, ফাতহুল বারি, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া

এমএম