২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না হলেও, আত্মরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে এবং কঠোর শুল্কের ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং, উড়োজাহাজ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), গম ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার বড়ো চুক্তি করেছে। যার বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে গম দেশে চলে এসেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২.৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৭ শতাংশ বেশি। অথচ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৬.২৫ শতাংশ।
বিশেষ করে, একক বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের রপ্তানি অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সার )তথ্য অনুযায়ী ৭.৫৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক এ পরিস্থিতিকে ‘অসম ক্ষমতার আলোচনার পরিবেশ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কের খড়্গ এড়াতে এই চুক্তি করা হলেও এটি দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটের মাঝে দেশের অভ্যন্তরে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিট এফডিআই ১৫.০২ শতাংশ কমে ১.৪৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। শীর্ষ ২০টি এফডিআই উৎস দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র স্থান না পেলেও নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য ও চীন এই তালিকার শীর্ষস্থানগুলো দখল করে আছে।
বিশেষজ্ঞ ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা মেটাতে মার্কিন বিনিয়োগ, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি কোম্পানি এক্সনমোবিল হোল্ডিংস করপোরেশন বাংলাদেশের অফশোর ব্লকে সিসমিক জরিপ ও গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করলেও, তার বাস্তবায়ন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর ভর্তুকির চাপ অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
অপরদিকে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ৫০টি দেশের নাগরিকদের জন্য পর্যটন ও ব্যবসায়িক (বি-১/বি-২) ভিসায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত আর্থিক জামানত বা ভিসা বন্ড-এর বিধান স্থায়ী করেছে। তালিকায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ভারতীয় নাগরিকদের এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে। ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটনের যুক্তি, ভিসার মেয়াদ শেষের পর অতিরিক্ত সময় অবস্থানের প্রবণতা রোধ করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৯.০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও এবং সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ মার্কিন বাজার থেকে আসলেও, আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান দিন দিন চওড়া হচ্ছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং মার্কিন বাণিজ্য নীতির বাস্তবতায় নতুন রাজনৈতিক সরকারকে এখন এক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও প্রবৃদ্ধি রক্ষা করতে হবে।
















