৮১তম জাতিসংঘ দিবস আজ।
আজ ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। ৫১টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটির সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ১৯৩ কিন্তু আট দশকের বেশি সময় পরও আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজায় মানবিক বিপর্যয়, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং জলবায়ু ও জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, বড়ো শক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিষদের মতপার্থক্য কার্যকর উদ্যোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সভাপতির দায়িত্বে বাংলাদেশ, সামনে সমঝোতার চ্যালেঞ্জ
এই দায়িত্ব বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সংলাপ এগিয়ে নেওয়া, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের সুযোগ দিয়েছে। তবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি এককভাবে আন্তর্জাতিক সংঘাতের সমাধান কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারেন না।
নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য-যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের ভেটো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হবে শুধু আন্তর্জাতিক উপস্থিতি নয়, বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং বাস্তবসম্মত সমঝোতার সুযোগ তৈরি করা।
সংস্কার ও মহাসচিব নির্বাচন ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ সময়
জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়াতে চলমান ‘ইউএন৮০’ সংস্কার উদ্যোগের আওতায় প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কাজের পুনরাবৃত্তি কমানো এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় জোরদারের চেষ্টা চলছে। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদে সংস্কার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়েছে। তবে সব প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে গৃহীত বা বাস্তবায়িত হয়েছে, এমন নয়। সংস্কারের অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করছে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ও সিদ্ধান্তের ওপর।
একই সঙ্গে সামনে রয়েছে নতুন মহাসচিব নিয়োগের প্রক্রিয়া। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। জাতিসংঘের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদে প্রার্থীদের বিবেচনা চলছিল, চূড়ান্ত সুপারিশ ও সাধারণ পরিষদের নিয়োগের তারিখ তখনো ঘোষণা করা হয়নি। ২০ অক্টোবর সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল-এ মনোনয়নের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে।
এলডিসি উত্তরণে সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ। জাতিসংঘের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬।
তবে ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। জাতিসংঘের উন্নয়ননীতি কমিটি নির্দিষ্ট শর্তে প্রস্তুতিকাল বাড়ানো সমর্থনযোগ্য বলে মত দেয়। ২১ জুলাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ বিষয়টি বিবেচনার জন্য সাধারণ পরিষদকে সুপারিশ করে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা, উন্নয়ন, অর্থায়ন ও দেশীয় শিল্পের সক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সাশ্রয়ী অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শান্তিরক্ষা ও রোহিঙ্গা সংকটেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদান দেশটির আন্তর্জাতিক পরিচিতির অন্যতম ভিত্তি। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে কর্মকর্তা পাঠানোর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অংশগ্রহণ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হয়েছে।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে জাতিসংঘ, মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব এ সংকটে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করলেও, বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ওপর।
বাংলাদেশের সামনে মূল পরীক্ষা
জাতিসংঘের ৮১তম বছরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নগুলোর একটি হলো, মতপার্থক্য ও সংঘাতের মধ্যেও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে কীভাবে কার্যকর রাখা যায়। বাংলাদেশের জন্যও সভাপতির দায়িত্বের তাৎপর্য এখানেই।
জাতিসংঘের সব সংকটের সমাধান বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। তবে সংলাপের পরিসর বাড়ানো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরা, সংস্কারপ্রক্রিয়ায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের এই অবস্থান কতটা বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ নেয়। কারণ, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় নেতৃত্বের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় পদমর্যাদায় নয়, বরং সমঝোতা তৈরির সক্ষমতা ও সম্মিলিত উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার ফলাফল-এ।
এস
















