মাশরাফি বিন মুর্তজা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের পোড় খাওয়া এক ক্রিকেটার। যার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে বিশাল ভান্ডার। যার রয়েছে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস। সেই আত্মবিশ্বাসের কাছেও হার মানে ইনজুরি।
যেখানে একবার সার্জনের ছুরির নিচে পড়েই ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছিলেন বিশ্বের বড় বড় ক্রিকেট তারকারা। সেখানে নির্দ্বিধায় এখনো বাইশ গজে আগুন ঝরিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আর একেই কিনা ক্যারিয়ার শেষ বলে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরে পাঠিয়েছিল বিসিবি।
যার খেলা থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারে প্রত্যেকটি নতুন প্রজন্ম। যারা প্রতিনিধিত্ব করবে পরবর্তী বাংলাদেশের। গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়ালটন ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আবাহনী লিমিটেড।
এ শিরোপা জয়ে বল হাতে জাত চিনিয়েছেন নড়াইল এক্সপ্রেস। ডিপিএলের ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বাধিক উইকেটের মালিক এখন তিনি। ১৬ ম্যাচে রেকর্ড ৩৯টি উইকেট ঝুলিতে পুরেছেন তিনি। ম্যাচশেষে তিনি জানিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা তার জন্য বিশেষ কিছু।
রূপগঞ্জকে হারানোর পর বিকেএসপিতে মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে মাশরাফি বলেন, আমি যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, তখন বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের স্বর্ণ সময় এবং এই প্রিমিয়ার লিগই ছিল আমাদের সবেদন নীলমনি। আমরা সবাই এই আসরটির দিকেই তাকিয়ে থাকতাম। তাই প্রিমিয়ার লিগের আবেদন আমার কাছে সব সময়ই অনেক বড়।
মাশরাফি বলেন, এখানে বেশিরভাগই আমাদের খেলোয়াড়রা খেলে। নিজেদের দেখানোর সুযোগটা তাই বেশি থাকে। সেই জায়গা থেকে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা বিশেষ কিছুই। এ ধরনের ম্যাচে খেলা থেকে মানসিক চাপটা বেশি থাকে।
আমরা এমন পরিস্থিতি নিয়ে হোমওয়ার্ক করেছি। এটা খুব কাজে লেগেছে। বিশেষ করে ব্যাটিংয়ে যদি দেখেন বিজয় আক্রমণাত্মক ছিল।
একজনকে সামনে থেকে আক্রমণাত্মক খেলতেই হয়। যেটা বিজয় করেছে। এরপর শান্ত এবং নাসির দারুণ ইনিংস খেলেছে। ক্রেডিট মূলত ব্যাটসম্যানদের। আমি মনে করি শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিজয়ের ইনিংসটা খুব ভালো ছিল। হয়তো এক’শ হতে পারত।
চ্যাম্পিয়ন হলেও মাশরাফি মনে করেন তাদের ব্যাটিংটা আরো ভালো হওয়া উচিত ছিল। অন্তত তাদের যে দল সেই বিচারে, ব্যাটিংয়ের কারণে যতোটা এগিয়েছি, আবার পিছিয়েছি।
আমাদের ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে আমরা যে দুটি ম্যাচ হেরেছি, সেটা ছিল হতাশার। ২৪৫ ও ২৪১ রান আমরা চেজ করতে পারিনি। এই ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে আমার মনে হয় ম্যাচে আমাদের আরও ভালো করা উচিত ছিল।
ওয়ালটন ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের মর্যাদা পাওয়ার পর আবাহনীর এটা দ্বিতীয় শিরোপা। ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির প্রশংসা করে তিনি বলেন, আবাহনী দলটি সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ। এই দল নিয়ে চ্যাম্পিয়ন না হওয়ার কোন কারণই ছিল না। এখন ভালো দল নিয়েও চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না।
অনেক সময় ছোট দলগুলোও ভালো ক্রিকেট খেলে। এই অবস্থায় বড় দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হয়। এগুলো নিয়ে আমাদের একটা ভয় ছিল এবং আমরা ওই পথে চলেও আসছিলাম। সবমিলিয়ে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি, এটাই বড় কথা।
দলে প্রত্যেকেরই কন্ট্রিবিউশন ছিল। যার যার জায়গায় সে তার সর্বোচ্চটা দেওয়া চেষ্টা করেছে। কিছু ম্যাচে হয়তো আমাদের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। তারপরও আমার কাছে মনে হয় বিজয়, শান্ত, মিঠুন কয়েকটা ম্যাচ ভালো খেলেছে।
নিজ দলের নাজমুল হোসেন শান্তর উচ্চসিত প্রশংসা করে মাশরাফি বলেন, ‘শান্তকে এখনই জাতীয় দলে নেয়ার কথা বলছি না। ওর সামনে প্রচুর সময় আছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার।
তবে সে দারুণ খেলেছে। এনামুল হক বিজয়ও ভালো খেলেছে। আজ (বৃহস্পতিবার) সেঞ্চুরি করতে না পারলেও, ভালো খেলেছে এবং লিগে তার খেলা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে।’
লিগের গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বলেন, এখানে সব সময় একটা চাপ থাকে। ক্লাব অফিসিয়ালদের চাপ থাকে। সুপার লিগের একটা চাপ থাকে। আপনারা এখানে ফোকাস করেন। কারণ এখান থেকেই জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় খেলে।
সুতরাং এই লিগটার গুরুত্ব অনেক। আমাদের দলে শান্ত আছে, বিজয় অসাধারণ খেলেছে। মিঠুন কয়েকটা ম্যাচে ভালো করেছে। সাইফ ভালো করেছে। কিন্তু টিম কম্বিনেশনের কারণে হয়তো শেষ কয়েকটা ম্যাচে খেলতে পারেনি। অন্য দলগুলোতে বেশ কিছু খেলোয়াড় আছে। সামনে ‘এ’ টিম কিংবা এইচপি টিমে তারা সুযোগ পেয়ে নিজেদের প্রমাণ করবে।
নড়াইল এক্সপ্রেস বলেন, আমার কাছে মনে হয় এবার লিগটা খুব জমজমাট ছিল। এবার ১২ পয়েণ্ট ছাড়া কেউ উঠতে পারেনি। ৫-৬টা দল সবাই ১০ থেকে ১২ পয়েন্ট নিয়ে কাছাকাছি ছিল।
আমরাও যখন সুপার লিগে উঠি, আমাদের পেছনের দলের পয়েন্ট পার্থক্য ছিল ২। ৬ নম্বর দলের পয়েন্ট ছিল ১০। মাত্র ৪ পয়েন্ট পার্থক্য ছিল ৬ নম্বর দলের। সবকিছু যদি রিভিউও করেন, লিগটা সত্যিকার অর্থেই ভালো ছিল।
বয়স হয়ে গেছে অনেক। খেলাই ছেড়ে দেয়ার কথা। ধীরে ধীরে শরীরও ভারি হয়ে উঠছে। এমন বয়সেও সর্বাধিক উইকেট শিকারী মাশরাফি। তার কাছে এটা খুব ভালো লাগার। মাশরাফি বলেন, মধ্য তিরিশে দাঁড়িয়েও প্রিমিয়ার লিগে সর্বাধিক উইকেট শিকারী হতে পেরে ভালো লেগেছে এই কারণে যে, আমি এখন ৫০ ওভারের ফরম্যাটের বাইরে আর কিছু খেলি না। সে ফরম্যাটে ভালো করার চেষ্টা ছিল।
ঢাকা লিগে শিরোপা জয়ের রেকর্ড বেশি। এটার রহস্য কী? জানতে চাইলে মাশরাফির হাস্যোজ্জল ব্যাখ্যা, ‘এটা ভাগ্য।’
এমআর





