হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ। এই কথাটা হয়তো অনেকের কাছেই সত্য। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ। আজকের স্বাধীনতা কি হঠাৎ এসেছিল। ইতিহাসের অনেক ঘটনার মত হারিয়ে যাবার পথে ঐতিহাসিক সলংগা গনহত্যার ইতিকথা। আজকের প্রজন্মের কতজন জানেন সেই ভয়াল ২৭ জানুয়ারী ১৯২২ সালের কথা। তাই তো এত বড় আত্মত্যাগের মহান দিবসটি আজ নীরবেই চলে গেল আমাদের মাঝ থেকে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী একটি আন্দোলনের নাম সলঙ্গা বিদ্রোহ। তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত ছিল সলঙ্গা। সেই সময় সলঙ্গা একটি ব্যবসায়ি জনপদের নাম । সপ্তাহে দুই দিন বসত হাট। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হত এই হাটে। শুক্রবারে বসত বড় হাট।
আজকের মত ইতিহাসের এই দিনটিও ছিল শুক্রবার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম মহাপুরুষ আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে সলঙ্গা হাটে শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। সেইদিন তর্কবাগিশের নেতৃ্ত্বে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের কর্মীরা হাটে বিলেতি পণ্য ক্রয় বিক্রয় বন্ধ করার প্রচারণা শুরু করেন ।
স্বাধীনতাকামীদের এই আন্দোলনকে দমন করতে ছুটে আসেন পাবনা জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আর. এন. দাস, জেলা পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রসাশক এস. কে. সিংহসহ ৪০ জন সশস্ত্র লাল পাগড়ীওয়ালা পুলিশের একটি দল।
সলংগার গো-হাটায় ছিল বিপ্লবী স্বদেশী কর্মীদের অফিস। পুলিশ কংগ্রেস অফিস ঘেরাও করে আটক করেন আন্দোলনের নেতা মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে।এই খবর প্রচার হবার পর চারদিক থেকে তর্কবাগীশের মুক্তির দাবিতে হাজার হাজার মানুষের মিছিল শুরু হয়। ম্যাজিষ্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও মহুকুমা অফিসারকে ঘেরাও করে জনতা প্রাণপ্রিয় নেতার মুক্তি দাবি করেন।
জনতার ঢল ও আক্রোশ দেখে ম্যাজিষ্ট্রেট জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে গুলি চালাতে নির্দেশ দেয়। এতেই রচিত হয় উপমহাদেশের প্রথম গনহত্যার ইতিহাস। বুলেট-বৃষ্টিতে ঝরেযায় সরকারী হিসেবে ৪৫০০ আর বেসরকারী হিসেবে ১০,০০০ হাজারেরও বেশি প্রাণ বলে জানাযায়। শীতল বাংলার মাটিতে প্রধম গনকবর হয় এই সলঙ্গা বিদ্রোহের শহীদদের রক্তমাখা দেহে।রহমতগঞ্জের গনকবরে অনেক অর্ধমৃত স্বাধীনতাকামীকেও মাটিচাপা দেওয়া হয়।
বস্ততপক্ষে ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সলংগা হত্যাকান্ডের ঘটনা যেমন সবচেয়ে নৃশংস পাশবিক তেমনি নিহতের সংখ্যা সর্বাধিক।৪০টি রাইফেলের মধ্যে মাত্র একটি রাইফেল থেকে কোনো গুলি বের হয়নি। ঐ রাইফেলটি ছিল একজন বাঙ্গালী পুলিশের।সলংগা হাটের হত্যাকান্ডের ঘটনা জালিয়নওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের চেয়ে বহুগুণ ভয়ংকর নৃশংস।
এত ত্যাগ, এত জীবনের শেষ নিঃশ্বাস যে আন্দোলনের পরতে পরতে সেই সলংগা গনহত্যা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে আজ অজানা কারনে পাথর চাপা পড়ে আছে। উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তথা শতাব্দির গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে চাপা পড়ে আছে।তাই আজ নিরবেই চলে যায় সলংগা গনহত্যা দিবস।
দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে সলংগা হাটের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। জানাতে হবে এই স্বাধীনতার প্রতিটি ধাপের ইতিকথা। আজকের এই দিনে সলংগা হাট গনহত্যার শহীদদের বিনম্র স্মরণ করছি।
নাজিব





