টানা সাত সপ্তাহের ছাত্র আন্দোলনের পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং কয়েকটি উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয় নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ এখন বিজেপির জন্য উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।

কীভাবে শুরু ‘ককরোচ’ আন্দোলন?

তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, চাকরির পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেই এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটে।

গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইনস্টাগ্রামে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়। পরে এটি ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়।

দিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ভারতের বিভিন্ন শহরেও। এতে বিভিন্ন ধর্ম, জাতপাত ও সামাজিক শ্রেণির তরুণদের অংশগ্রহণ দেখা গেছে।

উপনির্বাচনে বিজেপির ধাক্কা

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটিতে পরাজিত হয়েছে বিজেপি। এর মধ্যে বিহারের ব্যাংকিপুর আসনে দলটির হার বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে থাকা আসনটি হাতছাড়া হওয়াকে দলটির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে শুধু উপনির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে বিজেপির জনপ্রিয়তা কমে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী ও সংগঠিত দল।

তরুণদের মন জয়ে বিজেপির নতুন চেষ্টা

তরুণদের ক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছাতে নতুন কৌশল নিয়েছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তরুণদের আকৃষ্ট করতে চালানো হচ্ছে নতুন ধরনের প্রচারণা।

উত্তর প্রদেশেও তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

তবে বিজেপির এসব প্রচারণা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।

তাদের মতে, একসময় বিজেপি যেভাবে সহজেই তরুণদের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারত, সেই প্রভাব এখন আগের মতো নেই। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামের মতো বিকেন্দ্রীভূত প্ল্যাটফর্মে দলটির প্রচলিত প্রচারণা কৌশল খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না।

পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলেও মিলছে না সাড়া

আন্দোলনকারীদের দেশবিরোধী, বিদেশি অর্থায়নপুষ্ট কিংবা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তুলে ধরার বিজেপির পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলও এবার আগের মতো কার্যকর হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এর অন্যতম কারণ, আন্দোলনে বিভিন্ন ধর্ম, জাতপাত ও সামাজিক শ্রেণির তরুণদের অংশগ্রহণ। এমনকি বিজেপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত উচ্চবর্ণের হিন্দু তরুণদেরও আন্দোলনে দেখা গেছে।

ফলে আন্দোলনটিকে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন এখনই বিজেপির ক্ষমতার ভিত্তি নড়বড়ে করে দিয়েছে—এমনটা বলা যাবে না। তবে সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আন্দোলনে যুক্ত তরুণদের একাংশের দাবি, শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগই তাদের লক্ষ্য নয়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা ও নারীবিরোধী রাজনীতিসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার পরিবর্তন চান তারা।

কারত্ব, শিক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষ আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।

তবে বিজেপি তার হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসবে—এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং আগামী নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয় ও হিন্দুত্বের রাজনীতিকে আরও জোরালোভাবে সামনে আনার চেষ্টা করতে পারে দলটি।

সব মিলিয়ে, ‘ককরোচ’ আন্দোলন বিজেপির রাজনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ যে মোদি সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

এস