সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকার সিরডাপ অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক বহুদলীয় সংলাপে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।

সংলাপে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। আলোচনা সঞ্চালনা করেন সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বিবেচনা করেই ভোট দিয়েছে। সরকারের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও জনগণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। তাই ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

‘আমাদের ওপর আস্থা রাখুন’

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারকে গঠনমূলক চাপের মধ্যে রাখতে হবে। জনগণ ও নাগরিক সমাজের সমালোচনা ও নজরদারি না থাকলে সরকার পথ হারাতে পারে। তবে সেই চাপের ভাষা ও পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ করার ক্ষেত্রে বাধা থাকা উচিত নয়। সরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। রাতারাতি কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।

গুমের একটি অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সরকারের শূন্য সহনশীলতার নীতি রয়েছে। একই সঙ্গে গুমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জবাবদিহির একটি নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির কথাও জানান তিনি।

মানবাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আগের কাঠামোয় রাখলে সেটি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর মতো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা হচ্ছে।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আইন কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নয় যে তা পরিবর্তন করা যাবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী আইন সংশোধন করা সম্ভব। সরকারের কোনো সিদ্ধান্তে দুর্বলতা বা ভুল থাকলে সংশোধনের জন্য সরকার প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই সনদেও সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। যৌক্তিক কোনো প্রস্তাব এলে তা বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। সরকারের লক্ষ্য সামনে এগিয়ে যাওয়া, পেছনে ফিরে যাওয়া নয়।

‘গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সংস্কারের জন্য’

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সংস্কারের জন্য; এটি কোনো বিপ্লব নয়। সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা গেলে এই কঠিন প্রক্রিয়া সুস্থভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন বিষয়কে ভিন্নভাবে দেখছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করতে না পারায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফার চেতনাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তবে তা বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক অংশীজনকে গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।

দূরত্ব কমাতে নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পক্ষের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ঐকমত্য ছাড়া সংস্কারের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।

পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা রয়েছে। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

জাতীয় সংলাপের আহ্বান

জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় পরিচয় শক্তিশালী না হলে কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না। বিচারক নিয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এসব বিষয়ে সরকারকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক বলেন, র‍্যাবের নাম পরিবর্তন করে শুধু প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তাঁর মতে, ফ্যাসিবাদ যে পথে হেঁটেছে, তার বিপরীত পথে হাঁটতে না পারলে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।

একই দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের যে আস্থা ফিরে এসেছিল, তা নষ্ট করা উচিত নয়। গণভোটের রায় জনগণ দিয়েছে এবং সেই রায় বিএনপিকেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

মানবাধিকার ও গণমাধ্যম নিয়ে উদ্বেগ

সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলেও মব ভায়োলেন্স অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। ব্যাংকিং খাতেও মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

সিনিয়র সাংবাদিক ও চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলো এখনো নিশ্চিত হয়নি। গণমাধ্যমের ওপর থাকা অদৃশ্য বাধা দূর করে সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম ইকবাল হাসান মাজারে ভাঙচুর ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে হামলার ঘটনায় কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। পুলিশ সংস্কারে সরকারের অনীহারও সমালোচনা করেন তিনি।

এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, আইনের শাসন সবার জন্য সমান হতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। নাগরিকদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারকে কথার চেয়ে কাজে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

সংস্কারের রোডম্যাপ চাইলেন বিভিন্ন দলের নেতারা

বাংলাদেশ জাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য খাতের সমস্যার জন্য শুধু চিকিৎসকদের দায়ী করে মূল সংকট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমিশন নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে গণভোটের রায়কে গুরুত্ব দিয়ে তা বাস্তবায়ন করার বিকল্প নেই।

গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সরকারের কাজে ঘাটতি থাকলে জনগণ তা সহজেই বুঝতে পারবে। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিকভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ভবিষ্যতের কমিশনগুলো যেন দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, সে প্রত্যাশাও জানান তিনি।

সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে দায়িত্বশীল বক্তব্য ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। জনগণ এখন স্পষ্ট ও দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়।

‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে’

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বিদ্যমান কাঠামোয় ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। তাই গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন বলেন, বর্তমান সরকারের অনেক ব্যর্থতা থাকতে পারে। তবে তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের সময়ে কোনো রাজনৈতিক মানুষ গুমের শিকার হননি। মানবাধিকার সুরক্ষা ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া সমাবেশের অনুমতি না পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সেই প্রত্যাশার ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সংলাপে উঠে আসে আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পুলিশ সংস্কার, বিচারব্যবস্থা, স্বাস্থ্য খাত, জাতীয় ঐক্য, পররাষ্ট্রনীতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সবশেষে আলোচনার মূল সুর ছিল—নির্বাচনের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে। আর আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের পক্ষ থেকে যে বার্তা স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো সংস্কারের পথ থেকে সরে না গিয়ে জুলাই সনদের লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে যেতে চায় বিএনপি। তবে সেই পথ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার উত্তর নির্ভর করবে সরকারের কাজ, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।

এমএম