সোমবার সিপিডির আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি কাঠামোগত নানা সমস্যায় ছিল। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি না করায় এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, নতুন সরকারের কাছে মূলত দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতির দলিল নেই:
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিও খুব একটা ইতিবাচক ছিল না। ফলে অর্থনীতির উত্তরণের ধারা দুর্বল অবস্থায় ছিল—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
তবে সরকারের বড় দুর্বলতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সমন্বিত দলিল তৈরি না করার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, সরকার বারবার বলছে তারা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয়েছিল, তার একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোও বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে জানান ড. দেবপ্রিয়।
৩৬২ পদক্ষেপের ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’:
নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ মূল্যায়ন করতে সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা করেছে বলে জানান ড. দেবপ্রিয়। এসব পদক্ষেপকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর আওতায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নের আওতায় রাখা হয়েছে। সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি।
অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়।
রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা:
সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে।
তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি। এ ঘাটতি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। নিট বৈদেশিক সহায়তাও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তিন শিল্পাঞ্চলে বন্ধ ৯৫ কারখানা:
শিল্প খাতের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। একইভাবে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
এস