মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এ দাবি জানানো হয়। সভায় সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনের কর্মসূচি ও প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানায় সংগঠনটি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম। প্রধান অতিথি ছিলেন ফেডারেশনের প্রধান উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।
‘নিয়োগ কমিটির হাতে গেলে পুরোনো সংস্কৃতি ফিরবে’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তার দাবি, এ সিদ্ধান্ত অতীতে প্রচলিত নিয়োগ বাণিজ্য ও দলীয় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, অতীতে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার যে সংস্কৃতি চালু ছিল, ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সেটি আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে শিক্ষার মানের ওপর।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘জঘন্য দলীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই চক্রান্ত দেশের জনগণ মেনে নেবে না।’
তবে সভায় উত্থাপিত এসব বক্তব্য ও অভিযোগকে সংগঠনটির নিজস্ব অবস্থান হিসেবেই তুলে ধরা হয়। সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সভায় পাওয়া যায়নি।
এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ বহালের দাবি
সভায় বলা হয়, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই ও নিয়োগের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সংগঠনটির মতে, এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নিবন্ধন পরীক্ষা ও যোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলে স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করেন বক্তারা।
ফেডারেশনের নেতারা মনে করেন, শিক্ষকতা একটি বিশেষায়িত পেশা। ফলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচয় বা স্থানীয় প্রভাবের পরিবর্তে যোগ্যতা, মেধা ও পেশাগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের দাবি, বিদ্যমান বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এনটিআরসিএর মাধ্যমেই আগের মতো বহাল রাখতে হবে।
‘জুলাইয়ের চেতনা থেকে সরে যাওয়ার প্রমাণ’
শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তার ভাষ্য, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জুলাইয়ের আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের পরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তার দাবি, সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই নয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে এবং অধিকাংশ জেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এসব ঘটনাকে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও চেতনাবিরোধী বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কোটাপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠছে। তার মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষকদের ভোগান্তি নিয়েও উদ্বেগ
সভায় শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও আলোচনা হয়। মজলুম ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের অপমান-অপদস্ত করার ঘটনাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নেতারা। শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে সভায় মত দেওয়া হয়।
আন্দোলনের কর্মসূচির সিদ্ধান্ত
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে অর্পণের সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সভায় এর প্রতিবাদে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ লক্ষ্যে বিস্তারিত কর্মসূচি ও প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে শুধু নিয়োগপ্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না, দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া হিসেবে এনটিআরসিএ ব্যবস্থাই বহাল রাখা উচিত।
বৈঠকে অধ্যাপক রবিউল ইসলাম, অধ্যাপক নুরনবী মানিক, অধ্যাপক মাওলানা শাহজাহান মাদানী, অধ্যাপক মঞ্জুরুল হক, ড. আব্দুস সবুর মাতব্বর, মো. মতিয়ার রহমান, অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম সরকার এবং অধ্যক্ষ শফিকুল আলম হেলালসহ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
সভা থেকে সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিতে রাজি নয়। এনটিআরসিএর মাধ্যমে যোগ্য ও নিবন্ধিত প্রার্থীদের নিয়োগের আগের ব্যবস্থা বহাল না হওয়া পর্যন্ত এ ইস্যুতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে।
এমএম