তিনি বলেন, ওষুধ তৈরি থেকে শুরু করে রোগীর হাতে সঠিক মাত্রায় মানসম্পন্ন ওষুধ পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ফার্মাসিস্টরা ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন। তাদের পেশাগত মর্যাদা, যৌক্তিক অধিকার এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সময়োপযোগী স্বাস্থ্য কাঠামোর জন্য অপরিহার্য।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত “স্বাস্থ্য খাতে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ করণীয়” শীর্ষক এক জাতীয় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়।
ফার্মাসিস্টদের যৌক্তিক দাবি ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নআলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, “চিকিৎসক যেমন রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার দিক নির্দেশনা দেন, তেমনি সঠিক ওষুধ প্রয়োগ ও তা নিরাপদ রাখার টেকনিক্যাল দায়িত্ব পালন করেন ফার্মাসিস্টরা। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য কাঠামোর প্রতিটি স্তর—বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও গ্রামীণ হাসপাতালগুলোতে যদি ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের পদ সৃষ্টি ও নিয়মিত নিয়োগ বৃদ্ধি না করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ মানসম্মত ফার্মা-কেয়ার থেকে বঞ্চিত হবে।”
তিনি আরও আশ্বাস দেন যে, বর্তমান সরকার পেশাগত বৈষম্য দূর করা এবং দক্ষতা অনুযায়ী পদায়নের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের পদোন্নতির সুযোগ, বেতন বৈষম্য নিরসন এবং কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।জরুরি পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ কাঠামোর সংস্কার দাবিআলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট প্রতিনিধি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাদের কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন সংকট ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
আলোচকরা উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রতি চারজন চিকিৎসকের বিপরীতে অন্ত অন্তত একজন ফার্মাসিস্ট থাকা জরুরি হলেও দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এর চরম ঘাটতি রয়েছে।ফার্মাসিস্ট নেতারা সভায় তাঁদের কয়েক দফা প্রধান দাবি উত্থাপন করেন।
হাসপাতাল ফার্মেসি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ ‘হাসপাতাল ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা’ চালু করা এবং ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের দ্বারা ওষুধ বিতরণ নিশ্চিত করা।
নতুন পদ সৃষ্টি ও শূন্যপদ পূরণ: উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নতুন ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট পদ সৃষ্টি করে দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করা।পেশাগত মর্যাদা ও পদোন্নতি: ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নসহ চাকরির নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে পদোন্নতির ধারাবাহিক নীতিমালা প্রণয়ন করা।
মানহীন ওষুধের বাজার রোধ: প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করা এবং ভুল ওষুধ বিতরণ রুখতে রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে কাউন্টার সেবা পরিচালনা বাধ্যতামূলক করা।ওষুধের সঠিক ব্যবহার ও সুশাসনআলোচনা সভায় বিশিষ্ট বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে জটিল ব্যাধির প্রকোপ বাড়ার পাশাপাশি ওষুধের অপব্যবহার ও রেজিস্ট্যান্স একটি বড় জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বিশেষ করে চিকিৎসকের সঠিক পরামর্শ ও ফার্মাসিস্টদের সঠিক গাইডলাইন ছাড়া ফার্মেসি থেকে ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ কেনার প্রবণতা উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, একজন দক্ষ ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট কেবল ওষুধ বিক্রি করেন না; তিনি রোগীকে ডোজ, খাওয়ার নিয়ম, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেন। ফলে তাদের পেশাগত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশে মডেল ফার্মেসি গড়ে তোলা সম্ভব হলে ওষুধজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুলাংশে কমে আসবে। ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার আহ্বানঅনুষ্ঠানের শেষভাগে বক্তারা বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কারে একটি সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগত রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য খাতের গুণগত মান বাড়াতে ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের সমন্বিত টিমে রূপান্তরের তাগিদ দেওয়া হয়।সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে স্বাস্থ্যখাতকে সর্বাগ্রে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিবান্ধব করতে হবে।
ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টরা যদি নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতায় প্রতিনিয়ত হালনাগাদ থাকেন, তবে তারা কেবল দেশেই নয়, বিশ্ব পরিমণ্ডলেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবেন।”অনুষ্ঠানে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কর্মকর্তা এবং সিনিয়র সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রেস ক্লাবের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভার সুপারিশগুলো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এমএম