সোমবার দুপুরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন। রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এই মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় জামায়াত আমির বলেন, আমরা সংসদকে কার্যকর রাখতে চাই। কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। সরকারকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ সরকারকে সহযোগিতা করছি, কিন্তু ‘হাও ফার, হাও লং?’ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটি প্রতিবাদ ছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যায়যায়দিন সম্পাদক ও ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের (এনইসি) আহ্বায়ক শফিক রেহমান, আমার দেশ সম্পাদক ও এনইসির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, নয়া দিগন্তের সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ওয়াদার শফিকুল আলম, ইনকিলাবের এ এম এম বাহাউদ্দীন, প্রতিদিনের বাংলাদেশের মারুফ কামাল খান, মানবকণ্ঠের শহিদুল ইসলাম, কালবেলার সন্তোষ শর্মা, এদিন নির্বাহী সম্পাদক খন্দকার মোজাম্মেল হক, খবরের কাগজের মোস্তফা কামাল, ভোরের ডাকের কে, এম, বেলায়েত হোসেন, আজকের পত্রিকার কামরুল হাসান, দেশ রূপান্তরের সাহিদুল ইসলাম চৌধুরী, বাণিজ্য প্রতিদিনের গিয়াস উদ্দিন, করতোয়ার মোজাম্মেল হক, জনতার ওবায়দুর রহমান শাহীন, আগামীর সময়ের মোস্তফা মামুন, খোলা কাগজের আহসান হাবীব, নিউ নেশনের মোকাররম হোসেন, গ্রিন ওয়াচের মোস্তফা কামাল মজুমদার, দ্যা ইভিনিং নিউজের এ বি এম সেলিম আহমেদ, ডেইলি সানের আল আমিন, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাজ্জাদুর রহমান, সংগ্রামের শামসুল আরেফীন, সোনার বাংলার ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।
মতবিনিময় শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের আমন্ত্রণে সিনিয়র সম্পাদকরা এখানে এসেছিলেন। এ সময় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, সংসদে ও বাইরে বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে সে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। আমরা ভালো কজে সরকারকে সহযোগিতা করব, জনস্বার্থবিরোধী কাজে আমরা প্রতিবাদ করব—এই পলিসির ওপরই জামায়াত আছে। এই বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সম্পাদকদের অবহিত করেছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জনস্বার্থবিরোধী কাজে আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে যাব। এই বিরোধিতা ও প্রতিবাদ হবে গঠনমূলক ও নিয়মতান্ত্রিক। বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনীতি, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক—এগুলো নিয়ে জামায়াত আমিরের সঙ্গে সম্পাদকদের প্রশ্নোত্তর এবং মতবিনিময় হয়েছে। জামায়াত আমির জানিয়েছেন, প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের পলিসির বিষয়টি রোববার ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, সেটিই আমাদের পলিসি।
তিনি জানান, সম্পাদকদের পক্ষ থেকে জামায়াতের পার্লমেন্টের পলিসি তারা এপ্রিশিয়েট করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে এই প্রথম ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর, দলের নেতা ও পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় নেতা জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে প্রকাশ্যে খোলামেলা মতবিনিময়ে মিলিত হয়েছেন বলে সম্পাদকরা অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তারা বলেছেন যে, এরকম সুযোগ পেলে তারা মাঝে মাঝে তাদের মতামত জানাবেন । এছাড়া, সংসদে বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধীদলের এমপিদের মধ্যে উন্নয়ন কাজে বরাদ্দে, বিলিবণ্টনে, এমনকি পার্লামেন্টের ফ্লোরে কথা বলতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়ার তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে । বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, গণভোটের রায় কার্যকর করা, দ্রব্যমূল্য ও প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে জামায়াতের ভূমিকা এবং স্পিকার বা সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইনসাফপূর্ণ আচরণ না পেয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে ।
জামায়াত আমির গণতন্ত্র উত্তরণে দায়িত্ব পালনে বিরোধীদলকে সহযোগিতা করার জন্য সম্পাদকদের সাহায্য কামনা করেছেন। একইসঙ্গে যাতে লেখনির মধ্য দিয়ে জাতির কাছে সম্পাদকরা সত্য তুলে ধরেন সেই সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। এসময় সম্পাদকরা অতীতের বিরোধীদলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির ইতিহাস স্মরণ করে জামায়াতের ব্যতিক্রমী ও গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন। দেশকে স্থিতিশীল রেখে বিরোধিতার জায়গায় গঠনমূলক বিরোধিতা করা এবং সহযোগিতার জায়গায় সহযোগিতা করা—এটা তারা প্রথম দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত সংসদকে কার্যকর রাখতে একটি ‘কনস্ট্রাক্টিভ এবং রেসপন্সিবল’ অপজিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চান। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে; শুধু বিরোধীদল একা দায়িত্বশীল হতে পারে না, সরকারি দলের পক্ষ থেকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।
সম্পাদকরা পরামর্শ দিয়েছেন, আপনারা গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেন। জনগণের দাবি নিয়ে প্রয়োজনে রাজপথেও ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু আগের বিরোধীদলের মত অসহিষ্ণু ও সহিংসতার পথে গিয়ে দেশটাকে অস্থিতিশীল করবেন না। এ ব্যাপারে কয়েকজন সম্পাদক জামায়াত আমিরের সহযোগিতা চেয়েছেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে ১১ দলীয় ঐক্য তথা জামায়াতে ইসলামী তিল পরিমাণ ছাড় দেবে না। জনগণের রায়ের সঙ্গে আমরা আছি। পার্লামেন্টে যদি নিষ্পত্তি হয় আলহামদুলিল্লাহ, না হলে ৭০ ভাগ জনগণ যেখানে আছে আমরা সেখানেই চলে যাব। এই কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় আগামী ৫ তারিখ সকাল ৭টায় শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে লং মার্চের বিশাল গাড়িবহর যাত্রা করবে এবং সারাদেশে এই লং মার্চ সফল করতে গণমাধ্যমসহ সবার সহযোগিতা কামনা করি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রধান ইস্যু হচ্ছে এখন গণভোটের রায়, এর চেয়ে বড় পলিটিক্যাল ইস্যু আর হতে পারে না । যিনি এটার কোনো ভিত্তি নেই বলেন, তিনি হয়তো সরকারের চাটুকারকে খুশি করার জন্য তা বলেছেন। সম্পাদকরা জামায়াতের এই ধরনের আন্দোলনকে প্রশংসিত করেছেন যা রাজপথে এবং পার্লামেন্ট উভয় জায়গাতেই করা সম্ভব।
মতবিনিময় শেষে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বিরোধীদলীয় নেতা মিডিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন এবং তিনি বলেছেন যে, তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চান। সেই সঙ্গে তারা কিছু কিছু ব্যাপারে তাদের মনোকষ্টের কথা জানিয়েছেন। যেমন তারা জ্বালানি সংকট নিয়ে একটা বিশেষ অধিবেশন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতে সাড়া পাননি। তারপরেও তারা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা এবং পার্লামেন্টের সকল কর্মকাণ্ডের মূল জায়গা করতে চান। এজন্য সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, তাদের ভুল হলে যেন আমরা ধরিয়ে দিই এবং পরামর্শ দিই। তিনি আমাদের সঙ্গে নিয়মতি বসতে চান। আজকে তো সবাই মিলে বসা হয়েছে, এরপরে হয়তো আরো সিনিয়র সম্পাদকদের সঙ্গে বসবেন।
তিনি বলেন, আমরা সম্পাদকদের পক্ষ থেকে বলেছি যে, জুলাই বিপ্লবের পরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছে, মিডিয়ার স্বাধীনতা ফিরে এসছে। আমরা বলেছি যে, আমাদের কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকবে না, আমরা প্রথমসারির মিডিয়াগুলো প্রফেশনালি দায়িত্ব পালন করব ইনশাআল্লাহ।
মাহমুদুর রহমান আরো বলেন, বিরোধীদলের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা হলো—সবাই সব বিষয়ে কথা না বলে একটা জায়গা থাকলে ভাল হয়। এজন্য আমি ছায়া ক্যাবিনেট করার কথা বলেছিলাম। বিরোধীদলীয় নেতা জানিয়েছেন, তারা এটা করেছেন, সেটার প্রশিক্ষণ চলছে।
তিনি বলেন, আমি বলেছি, আগে দেখা গেছে, সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে। আশাকরি বর্তমান সরকার তা হবে না। কিন্তু সরকার যদি আগের মতো কোন মিডিয়ার প্রতি ফ্যাসিবাদী আচরণ করে, তাহলে বিরোধীদল যেন তার প্রতিবাদ করে।
প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে এক সম্পাদকের প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, আমরা ভারতের কাছ থেকে প্রতিবেশিসূলভ আচরণ প্রত্যাশা করি। আমরা সবকিছু উজাড় করে দিতে চাই না, নিতেও চাই না। এসময় বিরোধীদলীয় নেতা আরো বলেছেন, আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ সরকারকে সহযোগিতা করছি, কিন্তু ‘হাও ফার, হাও লং?’ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটি প্রতিবাদ ছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, মতবিনিময়ের জন্য সম্পাদকদের দাওয়াত দেওয়ায় বিরোধীদলীয় নেতাকে আমি ধন্যবাদ জানিয়েছি। তিনি বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বার আমার আসার সুযোগ হলো। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার আমন্ত্রণে এসেছিলাম। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদল গুরুত্বপূর্ণ । ১৯৯৬ সালের পর এবার বৃহত্তম বিরোধীদল হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মাহমুদুর রহমান বলেন, মূলধারার গণমাধ্যম সবসময় প্রফেশনাল ও বস্তুনিষ্ঠ দায়িত্ব পালন করে। জুলাই বিপ্লবের পর স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা চর্চার সুযোগ এসেছে। তবে সব সরকারই বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
মিডিয়ার ওপর ফ্যাসিবাদের সর্বপ্রথম আক্রমণ হিসেবে আমার দেশ বন্ধ ও আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বিরোধীদলকে ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালনের আহবান জানান।
এ সময় প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বিরোধীদলীয় নেতাকে অনুরোধ করেছি যে, ফ্যাসিবাদ এবং বিরোধীদলের নামে নৈরাজ্য অতিক্রম করে এসেছি। তাই গণতন্ত্রকে টেকসই করতে ফ্যাসিবাদ ও বিরোধীদলের নৈরাজ্য যেন আর ফিরে না আসতে পারে।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মাওলানা আব্দুল হালিম, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির মো. নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এস