আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে বটে, কিন্তু প্রকৃতির প্রবল শক্তির সামনে মানুষ আজও অসহায়। এমন বাস্তবতায় ইসলাম দুর্যোগকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখে না; বরং এটি ঈমান, আত্মসমালোচনা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধের আলোকে মূল্যায়ন করে। পাশাপাশি ইসলাম দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য এমন কিছু নীতিমালা প্রদান করেছে, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়েই প্রাসঙ্গিক।

১. ইসলাম শিক্ষা দেয়—দুর্যোগের সময় একজন মুমিন আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রাখবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা আল-বাকারা : ১৫৫) এই আয়াত আমাদের জানিয়ে দেয়, বিপদ-মসিবত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই দুর্যোগে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের প্রথম পরিচয়।

২. দুর্যোগের সময় তাওবা, ইস্তিগফার ও দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। বিপদ মানুষকে তার অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, সালাত আদায় করা এবং আন্তরিকভাবে দোয়া করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা আল-বাকারা : ৪৫) একজন মুমিন জানেন, প্রকৃত সাহায্য একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।

৩. ইসলাম শুধু দোয়ার শিক্ষা দেয় না; বরং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে বলেছিলেন, ‘আগে উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (জামে তিরমিজি) এই হাদিস আমাদের শেখায়, সতর্কতা, পরিকল্পনা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং তারই অংশ। তাই দুর্যোগের পূর্বাভাস মেনে চলা, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, উদ্ধার-প্রস্তুতি গ্রহণ এবং ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করা ইসলামি দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ।

৪. দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ঈমানের দাবি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা আল-মায়িদাহ : ২) বন্যার্ত মানুষের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, পোশাক ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া—এসবই ইসলামের দৃষ্টিতে মহৎ ইবাদত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি দুনিয়াবি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম : ২৬৯৯) আবার তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম) এসব হাদিস প্রমাণ করে, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক কাজ নয়; বরং আখিরাতের সফলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

৫. ইসলাম গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়াতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। দুর্যোগের সময় যাচাইহীন তথ্য, অতিরঞ্জিত সংবাদ বা আতঙ্ক সৃষ্টিকারী প্রচারণা মানুষের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ৬) বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই নির্দেশনার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।

৬. ইসলাম দুর্যোগকে কেন্দ্র করে অন্যায় লাভের সব পথ বন্ধ করতে চায়। ত্রাণ আত্মসাৎ, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। একজন মুসলমান সংকটকে ব্যবসার সুযোগ নয়, বরং সেবার সুযোগ হিসেবে দেখেন।

৭. দুর্যোগের সময় ইখলাস বা একনিষ্ঠতার গুরুত্ব অপরিসীম। দান-সদকা কিংবা মানবসেবা মানুষের প্রশংসা অর্জনের জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে নষ্ট করো না।’ (সুরা আল-বাকারা : ২৬৪) তাই সাহায্য এমনভাবে করতে হবে, যাতে বিপদগ্রস্ত মানুষের আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে।

৮. ইসলাম দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপরও গুরুত্ব দেয়। শুধু ত্রাণ বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, জীবিকা ফিরিয়ে আনা, শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, অসুস্থদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও ইসলামি দায়িত্বের অংশ। মানবকল্যাণে ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।

সবশেষে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে ‘এটি আল্লাহর গজব’ বলে ঘোষণা দেওয়া আমাদের কাজ নয়, যদি সে বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহতে স্পষ্ট দলিল না থাকে। একজন মুমিনের কাজ হলো বিপদ থেকে শিক্ষা নেওয়া, নিজের আমল পর্যালোচনা করা, তাওবা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

আজ আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় ইসলামের শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—দুর্যোগ শুধু রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। ব্যক্তি, পরিবার, মসজিদ, মাদরাসা, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক, ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্র—সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

এমএম