ভারতের প্রতিরক্ষা কূটনীতির ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক। আগে যেখানে দ্বিপাক্ষিক (দুই দেশ) বা ত্রিপাক্ষিক (তিন দেশ) মহড়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী, সেখানে এবার ১১টি দেশকে এক ছাতার নিচে আনা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া থেকে: নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (আসিয়ান) ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে: লাওস, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, সেশেলস, মালয়েশিয়া এবং কম্বোডিয়া।

মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে এই বিশাল আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্রোহ দমন এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের দক্ষতা বৃদ্ধি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, এই মহড়া আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা সম্পৃক্ততা বাড়াতে কাজ করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখন এশিয়ায় একটি 'সিকিউরিটি প্রোভাইডার' বা নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই মহড়ার মাধ্যমে ভারত তিনটি বার্তা দিচ্ছে, চীনের প্রভাব ঠেকানো: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির বিপরীতে ভারত নিজের বলয় শক্ত করতে চায়। তাই ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে এই মহড়ায় যুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেশী প্রথম (Neighbourhood First) নীতি: নেপাল ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর সঙ্গে মাঝেমধ্যে যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়, তা সামরিক কূটনীতির মাধ্যমে প্রশমিত করা।

কনসোর্টিয়াম মডেল: ভারত এখন আর একা নয়, বরং বন্ধু দেশগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর সামরিক জোট বা কনসোর্টিয়ামের মতো কাঠামো গড়ে তুলতে আগ্রহী।

তালিকায় বাংলাদেশ নেই কেন?

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে প্রায়ই 'রক্তের বন্ধন' বা 'সোনালী অধ্যায়' হিসেবে অভিহিত করা হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের সহযোগিতাকে ভারত সব সময় কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করে। মহড়াটি হচ্ছে মেঘালয়ে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে অনুষ্ঠিত মহড়ায় বাংলাদেশের নাম না থাকাটা বিষ্ময়কর।

দ্বিপাক্ষিক বনাম বহুপাক্ষিক অগ্রাধিকার: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নিয়মিত 'সম্প্রীতি' (SAMPRITI) মহড়া হয়। ভারত হয়তো বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এতটাই বিশেষ মনে করে যে, তাকে অন্য সাধারণ প্রতিবেশী দেশের তালিকায় যুক্ত করতে চায়নি।

কূটনৈতিক ভারসাম্য: বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ হয়তো কোনো বৃহৎ সামরিক ব্লকের অংশ হতে চায়নি, যা তার 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' নীতির পরিপন্থী হতে পারে।

কৌশলগত দূরত্ব: অনেক সময় কোনো দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক বিবেচনার কারণেও এমন মহড়ায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

'প্রগতি' মহড়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো বিদ্রোহ দমন। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে শান্তি বজায় রাখতে বাংলাদেশের ভূমিকা অপরিসীম। বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দমনে বাংলাদেশ ভারতকে যে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা দিয়েছে, তাতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন অনেক শান্ত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি কি এই সহযোগিতার ধরনে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? না কি এটি স্রেফ একটি রুটিন মহড়া যা নির্দিষ্ট কিছু দেশকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে?

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব

নেপাল ও ভুটানের মতো ল্যান্ডলকড বা স্থলবেষ্টিত দেশ এবং শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত তার স্থল ও জল—উভয় সীমান্তেই নিরাপত্তা বলয় জোরদার করছে। বিশেষ করে মিয়ানমারকে এই তালিকায় রাখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকারের সঙ্গে পশ্চিমারা দূরত্ব বজায় রাখলেও ভারতের জন্য দেশটি কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।

অন্যদিকে, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, ভারত এখন দক্ষিণ চীন সাগরের দেশগুলোর সঙ্গেও সামরিক বন্ধন গভীর করতে চায়। এই বড় পরিসরে বাংলাদেশের না থাকাটা আঞ্চলিক রাজনীতিতে ঢাকার গুরুত্ব হ্রাসের লক্ষণ নাকি একচ্ছত্র স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক, তা নিয়ে বিতর্ক চলবে।

'প্রগতি' মহড়া ভারতের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। ১১টি দেশের সেনাবাহিনীকে এক জায়গায় আনা এবং তাদের সমন্বয় করা ভারতের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির প্রতিফলন। তবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশকে বাইরে রেখে এই 'প্রগতি' কতটা পূর্ণতা পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মেঘালয়ের পাহাড়ে যখন কামান আর রাইফেলের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হবে, তখন সীমান্ত ওপার থেকে বাংলাদেশের নীরবতা হয়তো প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবাবে।

ভারতের এই নতুন প্রতিরক্ষা কূটনীতি কি এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখবে? নাকি এর ফলে কোনো নতুন মেরুকরণ তৈরি হবে, তার উত্তর পাওয়া যাবে নিকট ভবিষ্যতে। তবে আপাতত, 'প্রগতি'র তালিকায় বাংলাদেশের না থাকাটাই আলোচনার সবচেয়ে বড় শিরোনাম।

এমএম