ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশের পর মন্ত্রী এই ভিডিওকে ফেক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ভাইরাল হওয়া ছবি-ভিডিও সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। তার ভাষ্য, এটি রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত অপপ্রচারের অংশ হতে পারে। ঢাকার একাধিক সংবাদপত্রে মন্ত্রীর বক্তব্যর সমর্থনে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দাবি করা হয় এই ভিডিও ভুয়া, এআই দিয়ে তৈরি। এছাড়া তার নির্বাচনি এলাকায় ভুয়া ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ এনে বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করেছে।

প্রতিমন্ত্রীর এই দাবি দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ হওয়ার পরের দিন ২৯ জুলাই ফ্যাক্টচেক ভিত্তিক পোর্টাল দ্য ডিসেন্ট তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত অন্তরঙ্গ আংশিক ছবি এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবি ও ভিডিওর সূত্র ধরে পঞ্চগড় ও ঢাকার একাধিক সাংবাদিকের কাছ থেকে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সাথে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ২০ সেকেন্ডের শব্দহীন ভিডিও, ৫টি ছবি ও হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট যাচাইয়ের জন্য সংগ্রহ করে দ্য ডিসেন্ট। সংগ্রহকৃত ছবি ও ভিডিওর রেজুলেশন সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবি ও ভিডিওর চেয়ে বেশি। সংগৃহীত সবগুলো ছবি ও ভিডিও এআই কন্টেন্ট চিহ্নিতকরণে ব্যবহৃত একাধিক টুল দিয়ে যাচাই করলেও কোনটিতেই ছবি ও ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি- এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অধিকতর অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দ্য ডিসেন্ট সংগৃহীত ছবি ও স্ক্রিনশটগুলো বিশ্লেষণ করে আরও কিছু তথ্য পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশটগুলোর একটিতে একজন নারীর শাড়ি পরিহিত ছবি এবং একটি বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর দেখা যায়।

মোবাইল ব্যাংকিং সেবার অ্যাপ থেকে দেখা যায়, আলোচ্য মোবাইল নম্বরে যে বিকাশ পারসোনাল একাউন্ট রয়েছে সেটির অমুসলিম এক নারীর নামে (নামটি দুই শব্দের)। ওই নারীর বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করলে দেখা যাচ্ছে তার বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের সেই গ্রামে যেটি প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনেরও গ্রাম। ওই নারীর জন্ম ১৯৯৫ সালের জুন মাসে।

এরপর ওই মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করার পর একজন নারী রিসিভ করেন এবং তার নাম জানান, যা বিকাশ একাউন্ট যার নামে সেটির সাথে মিলে যায়।

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনে এই নম্বরটি পাওয়া গেছে উল্লেখ করে তাকে জানানো হয়, ওই কথোপকথনে একজন শাড়ি পরা নারীর ছবি দৃশ্যমান। জানতে চাওয়া হয়, ছবিটি যাচাইয়ের জন্য তার কাছে হোয়াটসআ্যাপের পাঠানো যাবে কিনা? তিনি অনুমতি দিলে ছবিটি পাঠানোর পর ওই নারী জানান, ছবিটি তারই।

তবে তিনি বলেন, তার ছবি সেখানে কীভাবে এলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

যদিও দ্য ডিসেন্ট ছবিটিতে এআইয়ের কারসাজির কোন প্রমাণ পায়নি একাধিক টুলে যাচাই করে। এরপর ওই নারীকে জিজ্ঞেস করা হয় ভাইরাল হওয়া ছবি/ভিডিও বা স্ক্রিনশটগুলোর বিষয়ে তিনি কোন কিছু জানেন কিনা। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।

তাকে আরো জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি এমপি ফরহাদ হোসেন আজাদকে চেনেন কি না। তার উত্তর ছিল, “একজন এমপিকে চিনবো না কেন।”

ওই নারীকে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করেন এমন প্রতিবেশী এক অমুসলিম ছাত্র (যিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন) দাবি করেছেন, তিনি শুনেছেন ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর ওই নারীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ফরহাদ হোসেন।

ডিসেন্টের প্রতিবেদক দুই দফায় সংশ্লিষ্ঠ নারীর সাথে কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর রাত ১০:০২ মিনিটে এই প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ০১৭০৭ সিরিয়ালের একটি বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর থেকে কল আসে এবং নাম ভেসে ওঠে ‘FORHAD HOSSAIN AZAD’। একবারই কল এসেছে ওই নম্বর থেকে। এই প্রতিবেদকের সাথে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের কোন পূর্ব পরিচয় বা যোগাযোগ ছিল না এবং এই প্রতিবেদক যে এই ছবি ও ভিডিও যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন তা ওই নারীর সাথে যোগাযোগের আগে অন্য কারো সাথে আলোচনা করেননি।

প্রতিবেদক তখন কল রিসিভ না করে বুধবার সকালে ওই নম্বরে কল করেন। রিসিভ না হওয়ায় প্রতিবেদক হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট দিয়ে রাখেন এবং এরপর ওপরে প্রাপ্ত নম্বর থেকে কল আসে। প্রতিবেদক রিসিভ করে কুশল বিনিময়ের পর জানতে চান এটি কি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের নম্বর কিনা? তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। রাত ১০টার পরপর ফোন দেয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, “আসেন, আমার দপ্তরে আসেন, চা খাই।” এরপর সংযোগ সমস্যার কারণে কলটি কেটে যায়। পরবর্তীতে ফোন করলে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে কেটে দেন ফরহাদ হোসেন।”

মারিয়া সরকার এলিনের স্ট্যাটাস

এদিকে গতকাল দুপুরে মারিয়া সরকার এলিন নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে। নিজেকে উপস্থাপক হিসেবে দাবি করে দেওয়া এলিনের স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

“আমি একজন উপস্থাপিকা। কোন রাজনৈতিক ব্যাক্তি নই ৷ উপস্থাপিকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে সুনামের সাথে সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করে আসছি। পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সংগঠক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ছবি তোলার সুযোগ হয়েছে। এসব ছবি সম্পূর্ণরূপে পেশাগত ও অনুষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট।

এর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তথাকথিত " "দ্যা ডিসেন্ট " আমার একটি বিকৃত ছবি ব্যবহার করে ছাত্রলীগের এক নেতা নোমানের সঙ্গে আমার অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালিয়ে আমার ব্যক্তিগত সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

দুঃখজনকভাবে, একই কায়দায় আবারও বর্তমান পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জনাব ফরহাদ হোসেন আজাদ মহোদয়ের সঙ্গে অতীতে Red কফি শপে ধ্রুবতারা সংগঠনের কার্যক্রম উপলক্ষে একই টেবিলে বসে তোলা একটি সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক ও পেশাগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিতপূর্ণ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এটি আমার ব্যক্তিগত সম্মান, সামাজিক অবস্থান ও পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কারও সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠান, সভা বা সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কিংবা সৌজন্য ছবি তোলাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে চরিত্রহনন ও মানহানির অপচেষ্টা সম্পূর্ণ অনৈতিক, নিন্দনীয় এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

অতএব, আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর প্রচারণা অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করছি। অন্যথায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পেজের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মানহানি ও প্রযোজ্য অন্যান্য ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আমি বাধ্য হব।”

গ্রামের কেউ মুখ খুলতে চাইছেন নান

ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে জানতে এবং ডিসেন্ট-এর অনুসন্ধানে যে নারীর সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে তার সন্ধানে গতকাল আমার দেশ এর প্রতিনিধি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নে যান। প্রতিমন্ত্রীর গ্রামের বাড়িও সেখানে। এলাকায় গেলে তিনি গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। এলাকাটি হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত। এলাকার লোকজনের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিও নিয়ে কথা বললে তারা জানান, ভিডিও ভাইরালের বিষয়টি তারা জেনেছেন। কেউ কেউ দেখেছেন। তবে ঘটনা সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না বলে জানান। সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় অনেকের চোখে মুখে ভয়ে ছাপ দেখা যায়। নাম প্রকাশ করে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি।

বিএনপি’র সংবাদ সম্মেলন

এদিকে আমাদের পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এর ছবি এআই ব্যাবহার করে ভূযা ভিডিও এবং ছবি শিবির মিডিয়া সেল পেজে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে পঞ্চগড়ে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। বুধবার রাতে পঞ্চগড় জেলা এবং পৌর বিএনপি সহ অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে লিখিত বক্তব্য দেন জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহ আলম মামুন রনিক, আরো বক্তব্য দেন পৌর বিএনপির সদস্য পঞ্চগড় জেলা জজ আদালতের সাবেক জিপি ও পঞ্চগড় আইনজীবি সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক এডভোকেট আব্দুল বারি, জেলা বিএনপি’র সদস্য ইউনুস শেখ। বক্তারা বলেন, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের কাজ কর্মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন আস্থা বিশ্বাস অর্জন করছেন, তার কাজে পঞ্চগড় সহ দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন তখন একটি দল তার সম্মান ক্ষুন্ন করতে তার জনপ্রিয়তাকে ধস নামাতে ষড়যন্ত্র করে শিবিরের পেজে এআই ব্যবহার করে তার ছবি ইডিট করে ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। আমরা এর তিব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানিয়ে সেই সাথে ভূয়া ছবি দিয়ে ফেসবুকে প্রচারকারীদের খুঁজে বের করে তাদের শাস্তি দাবি করেন। যদি দাবী মানা না হয় তাহলে দলীয়ভাবে আলোচনা করে কঠোর কর্মসূচির হুশিয়ারি দেন বক্তারা। জেলা বিএনপির আহবায়ক জাহিরুল ইসলাম কাচ্চু বলেন, একটি মহল নানা ভাবে ষড়যন্ত্র করে প্রতিমন্ত্রীর সুনামক্ষুন্ন করার চেষ্টা করে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। এবং এই অপপ্রচার কারীদের অচিরেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এদিক সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে ভিডিও ভাইরালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির মধ্যে উৎকন্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রাতে মন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা দেবীগঞ্জ এবং বোদা উপজেলায় বিএনপি, যুবদল, এবং ছাত্রদলের প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে।

পঞ্চগড় জেলা শহরেও প্রতিবাদ সভা করেন জেলা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এদিকে এই ঘটনার প্রতিবাদ করে জেলার বোদা এবং দেবীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল মহিলা দল প্রতিবাদ সমাবেশ সহ বিক্ষোভ করেছেন। সারা জেলা জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।

এমএম