মঙ্গলবার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের একথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

আসাদুজ্জামান বলেন, জ্ঞানপাপী একজন জাস্টিস ছিলেন খায়রুল হক নাম। উনি মূল রায় থেকে ডিভিয়েন করে (পথভ্রষ্ট) ১৭ মাস পর রায় প্রকাশের সময় উনি সেখানে বলেছেন, পরবর্তী দুটি নির্বাচন কোন ফর্মে হবে তা সংসদে ঠিক হবে। উনাদের থেকে দলছুট হয়ে সিনহা বাবু বলছেন (বিচারপতি এস কে সিনহা), আগামী দুটি নির্বাচনই হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্ডারে। খাইরুল হকের সঙ্গে তাল মিলালেন... ওই যে আরেকটার নাম... জুডিশিয়ারিকে যে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন।

তখন একজন বলেন, মানিক (সাবেক বিচারপতি) সাহেব, এরপর অ্যাটর্নি বলেন, না না, জুডিশিয়ারি মানিক যতটুকু ধ্বংস করেছে, তার চেয়ে ধ্বংসের পেছনে দায়ী সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (সাবেক প্রধান বিচারপতি) নামে একজন জাস্টিস ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ আজকের রায়ের মধ্যে বলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাংবিধানিকভাবেই বৈধ সরকার। ১০৬ অনুচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে মতামত নিয়ে করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ফুল বেঞ্চ মতামত দিয়েছেন, এটি সাংবিধানিক ওপিনিয়ন। আপিল বিভাগ সাংবিধানিক মতামতে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ওনাদের কাছে বলেছেন, সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলে গেছেন, অন্য কাউকে ডেকে সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে আইনি কোনো বাধা আছে কি না। সুপ্রিম কোর্ট গোটা প্রেক্ষাপট বিবেচনা নিয়ে বলছে, এটা বৈধ ও সাংবিধানিক সরকার হবে। এটার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সাংঘর্ষিক কোনো প্রভিশন নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে অন্তর্বর্তী সরকারই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামকরণ হবে মত তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সরকারই তত্ত্বাবধায় সরকারে রি-নেমড হবে, যেমন আমি বলি- জেলা ও দায়রা জজের নাম শুনেছেন। একই ব্যক্তি যখন সিভিল মামলা করেন তখন তাকে বলা হয় জেলা জজ। ওই একই ব্যক্তি যখন ক্রিমিনাল মামলা পরিচালনা করেন, তখন তাকে জেলা জজ বলা যায় না, তখন তিনি দায়রা জজ। এই ব্যক্তিগুলোই যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সিস্টেমে চলে যাবে উনারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হবেন। এটা সাংবিধানিক সাংঘর্ষিকের কোনো জায়গা নেই।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপিল বিভাগে যে রিভিউ পেন্ডিং আছে তা বাইপাস করেই এই রায়ের প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেন আছে, তত্ত্বাবধায়কের ত্রয়োদশ সংশোধনীতে দুটি রেশিও, এক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বৈধ নাকি অবৈধ। এই পার্টে চারজন বললেন, চারজন বলছেন অবৈধ, তিনজন বললেন, বৈধ। দ্বিতীয় পার্টে সবাই বললেন, পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হবে। এই যে পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হবে, তার আগেই পঞ্চদশ সংশোধনী চলে এসেছে, তাহলে ধরে নেওয়া হবে, ওই জাজমেন্ট রেশিও এখনও অপারেটিভ আছে, কার্যকর আছে। তাহলে কমপক্ষে আগামী দুটি নির্বাচন তো আপিল বিভাগের এটেনশন লাগে না।

একইদিন জামায়াতের আইনজীবী মোহাম্মাদ শিশির মনির বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করেনি, কিছু জিনিস রেখে দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নিরাপত্তায় বিষয়টি সংরক্ষণ করেছেন।

তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে যে বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল তার পুনরিজ্জীবিত করা হয়েছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোট পদ্ধতি বাতিল করে দেওয়ার বিষয়টিও পুনরুজ্জীবিত করা হলো।

‘সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৭ক এবং ৭খ অনুচ্ছেদের সংসদের যদি কেউ সংবিধানের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করে তাহলে সেটাকে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয়টিও বাতিল করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ৪৪ অনুচ্ছেদ নিম্ন আদালতের কাছে উচ্চ আদালতের কিছু ক্ষমতা হস্তান্তর করার বিষয়টিও বাতিল করা হয়েছে।’

শিশির মনির বলেন, এর বাইরে সংবিধানে জাতির পিতা, ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণাসহ পঞ্চদশ সংশোধনীতে আরও যে সমস্ত বিষয় রয়েছে সেগুলো পরবর্তী জাতীয় সংসদে সেখানে আলাপআলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বলেছেন হাইকোর্ট। যেগুলো ভালো মনে করেন সেগুলো রাখবেন, সেগুলো অপ্রয়োজনীয় মনে করবেন সেগুলো বাতিল করবেন।

এক প্রতিক্রিয়ায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শরীফ ভূইয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার ফলে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল, একইসঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছিল। নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করার ফলে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু হয়েছিল। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলকে অবৈধ ঘোষণা করা হলো।

আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে শুধু সাংবিধানিকই নয়, একইসঙ্গে সংবিধানের মূল কাঠামোর অংশ বলে রায় দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলকে শুধু অবৈধই নয়, আদালত বলেছেন- যেহেতু নির্বাচন, গণতন্ত্র সংবিধানের মূল কাঠামো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের মূল কাঠামোরও একটি অংশ। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্র এবং নির্বাচনকে সুসংহত করে, সেহেতু তত্ত্বাবায়ক ব্যবস্থা সংবিধানের একটি মূল কাঠোমো।

পঞ্চদশ সংশোধনীর এই অবৈধ ঘোষণার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে বলে জানান শরীফ ভূইয়া। বলেন, ‘তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এখনই ফিরে এসেছে বলা যাবে না। কারণ এই ব্যবস্থাকে দুইভাবে বাতিল করা হয়েছিল। প্রথমত আপিল বিভাগ, বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে একটি রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। পরবর্তীতে সংসদ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে। আপিল বিভাগের ওই রায়ের পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) রায়ে পরিবর্তিত হতে হবে। এ বিষয়ে একটি রিভিউ শুনানিতে আছে।

এনএইচ