অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। তবে অবরোধ প্রত্যাহার কিংবা সংকট নিরসনে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
সংঘর্ষের পর পরিস্থিতির অবনতি
গত ২২ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজার এলাকায় অবরোধ চলাকালে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই সময় সাজেকে বেড়াতে যাওয়া প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়ার আশঙ্কায় পড়েন। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তায় ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর থেকে সাজেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। উজোবাজার এলাকার অধিকাংশ দোকানপাটও বন্ধ থাকায় দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পাঁচ দফা দাবি জানাল দুই সংগঠন
গত ২২ অক্টোবরের ঘটনার প্রতিবাদে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা দ্রুত এসব দাবি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- অবরোধকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্ট মামলা প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
- উজোবাজারে ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং সেখান থেকে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার।
- সংঘর্ষে আহত নারী-পুরুষের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন।
- জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করা।
- আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধের পাশাপাশি তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি না চালানো।
সংগঠন দুটির নেতাদের অভিযোগ, উজোবাজারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকে বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও তাঁরা দাবি করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আগেও অবরোধের কারণে আটকা পড়েন পর্যটক
সাজেকে চলমান সংকটের সূত্রপাত আরও আগে। গত ১১ অক্টোবরও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছিল। ওই সময় সাজেকে সশস্ত্র ব্যক্তিদের অবস্থান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে বিভিন্ন দাবি জানায় সংগঠন দুটি।
অবরোধের কারণে সাজেক ও খাগড়াছড়ির মধ্যে যান চলাচল ব্যাহত হয়। আটকা পড়েন বহু পর্যটক। পরে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর উদ্যোগে তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ শিথিল থাকায় সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াত আবার শুরু হয়েছিল। কিন্তু ২২ অক্টোবর নতুন করে অবরোধ শুরু হওয়ায় পর্যটন কার্যক্রম আবারও স্থবির হয়ে পড়ে।
অবরোধকারীদের দাবি, তাঁদের উত্থাপিত সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পুনরায় কর্মসূচি দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থায় স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নিরাপত্তা জোরদার, স্বাভাবিক হয়নি যোগাযোগ
২২ অক্টোবর উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। পরে সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব জানিয়েছিলেন, সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছেন।
ঘটনার পর পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। বর্তমানে সাজেক সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে নিরাপত্তা টহল বাড়ানো হলেও অবরোধের কারণে যান চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
এদিকে, সাজেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২৪ অক্টোবর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে দুই জেলার কয়েকটি সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কর্মসূচি শেষে কিছু এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও সাজেকের মূল সড়কের অবরোধ বহাল রয়েছে।
পর্যটকশূন্য সাজেকে বিপাকে ব্যবসায়ীরা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সাজেকের অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটননির্ভর। এখানকার রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, দোকানপাট এবং পর্যটকদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন বহু মানুষ।
অবরোধের কারণে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পর্যটকদের বুকিং বাতিল, যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং রিসোর্ট-কটেজে অতিথি না থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাজেক রিসোর্ট কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জাগো নিউজকে বলেন, সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। পর্যটকদের ভ্রমণের বিষয়ে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞাও বহাল রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসার কোনো উদ্যোগ তিনি দেখতে পাননি।
পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কর্মচারী, গাড়িচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পণ্য সরবরাহকারীরাও সংকটে পড়েছেন। দীর্ঘদিন আয় বন্ধ থাকলে তাঁদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা
রাঙামাটির পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব জানিয়েছেন, অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে অবরোধ প্রত্যাহার, পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়ন কিংবা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অবরোধকারী সংগঠন দুটির সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠকের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাজেকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংঘর্ষের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দাবিগুলো যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু, পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
অবরোধের চতুর্থ দিনেও সমাধান না আসায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকটের অবসান না হলে সাজেকের পর্যটন খাত ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ক্ষতির বোঝা আরও ভারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনএইচ
















