বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই চলাচল করছে কমপক্ষে ৭ হাজার সিএনজি অটোরিকশা। এসব থেকে প্রতিমাসে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। হারুনুর রশিদ নামের এক প্রভাবশালী শ্রমিক নেতার নেতৃত্বে এ চাঁদাবাজি চলছে।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশার চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে হাইকোর্টে একের পর এক রিট করছেন এই শ্রমিক নেতা। সড়ক-মহাসড়কে চলাচলের জন্য সিএনজি অটোরিকশার অনুমতি (রেজিস্ট্রেশন) দেওয়ার এখতিয়ার বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) হলেও চট্টগ্রাম মহানগরীতে অবৈধ সব সিএনজি অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন প্রদান করছেন হারুনুর রশিদ।

তিনি চট্টগ্রাম অটোরিক্সা-অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এই পরিবহন শ্রমিক নেতার দেওয়া রেজিস্ট্রেশনে চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচল করছে কমপক্ষে ৭ হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা। হারুনের দেওয়া রেজিস্ট্রেশনের নম্বরও অদ্ভুত।

গাড়ির পেছনে লেখা থাকে চট্টমেট্রো-থ-১২ বা ১৩- অঋজ এবং গাড়ির সামনের গ্লাসে লাগানো থাকে হারুনের স্বাক্ষর করা বিশেষ স্টিকার। আর এই স্টিকার লাগানো থাকলে কোনো সিএনজি অটোরিকশা আটক করে না বিআরটিএ কর্মকর্তা বা ট্রাফিক সার্জেন্ট।

এই বিশেষ স্টিকারের মাধ্যমে হারুন প্রতিমাসে সিএনজি অটোরিকশার মালিকদের কাছ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এর বড় একটি অংশ পুলিশ এবং বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকেও দেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২০০৫ সাল থেকে নতুন কোনো সিএনজি অটোরিকশাকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ রয়েছে।

২০১৩ সালে মাত্র ১ হাজার ২০০টি সিএনজি অটোরিকশাকে রেজিস্ট্রেশন প্রদানের জন্য আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন হারুনুর রশিদ। এর পরই প্রথম দফায় হারুনুর রশিদের চাঁদাবাজির দ্বার উন্মোচন হয়। রিটের ফলে আদালত চট্টগ্রাম মহানগরীতে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চলাচলে বাধা না দিতে পুলিশ ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়।

১ হাজার ২০০টি সিএনজি অটোরিকশার জন্য রিট করলেও হারুনুর রশিদের বিশেষ স্টিকার নিয়ে হাজার হাজার অটোরিকশা চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচল করছে। চাঁদাবাজির সুযোগ আরো পাকাপোক্ত করতে গত ৩ নভেম্বর হারুনুর রশিদের সংগঠনের সদস্যদের নামে আরো ২ হাজার ১০৬টি নতুন সিএনজি অটোরিকশা কেনা হয়েছে।

এসব অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে নতুন একটি রিট করেছেন হারুন। জানা গেছে, সদ্য কেনা রেজিস্ট্রেশনবিহীন একটি সিএনজি অটোরিকশা চট্টগ্রাম মহানগরীতে চালানোর জন্য প্রথমে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে হারুনুর রশিদের সমিতিতে ভর্তি হতে হয়। এর পর হারুনুর রশিদ ওই সিএনজি অটোরিকশাকে বিশেষ একটি কোড নম্বরযুক্ত বিশেষ স্টিকার দেন।

এই স্টিকারটি গাড়ির সামনের গ্লাসে লাগিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচল করলে এটিকে আর বাধা দেয় না পুলিশ বা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। একবার স্টিকার লাগানোর পর একই সিএনজি অটোরিকশাকে প্রতিমাসে হারুনুর রশিদকে চাঁদা দিতে হয় ২ হাজার টাকা করে। বর্তমানে চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে গাড়ি চালানোর চেয়ে রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই গাড়ি চালানো অনেক নিরাপদ বলে সিএনজি অটোরিকশার চালক-মালিকরা জানিয়েছেন।

তাদের মতে, গ্রাম এলাকার জন্য রেজিট্রেশনপ্রাপ্ত সিএনজি অটোরিকশাগুলো প্রকৃত রেজিস্ট্রেশন নম্বর গোপন করে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া হারুনুর রশিদের স্টিকার নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচল করছে নির্বিঘ্নে। হারুনুর রশিদের স্বাক্ষর করা স্টিকারধারী একটি সিএনজি অটোরিকশার মালিক সাইফুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে জানান, হারুনের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে স্টিকার কিনে নেওয়ার পর নগরীতে গাড়ি চালাতে কোনো সমস্যা হয় না।

ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্টরাও এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করেন না। সবকিছু হারুনই ম্যানেজ করেন। সিএনজি চালকরা জানান, আমাদের কাছ থেকে স্টিকার বাবদ ৫ হাজার টাকা এবং মাসিক ২ হাজার টাকা করে চাঁদা নেন হারুন। এই টাকা দিয়ে তিনি পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ এবং বিআরটিএ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেন।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এ কে এম শহীদুর রহমান বলেন, মামলা জটিলতার কারণে চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। মামলার বিষয়টি সুরাহা হলেই রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা উচ্ছেদ করা হবে। অন্যদিকে হারুনুর রশিদ বলেন, মামলার খরচ চালানোর জন্য এই চাঁদা নেওয়া হয়। তা ছাড়া এই চাঁদার টাকা দিয়েই সবকিছু ম্যানেজ করতে হয়।

এমএ