তিন বছর আগের কথা। এসআই আনোয়ার পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন শাহ আলমের স্ত্রীর সঙ্গে। বর্তমানে আনোয়ার স্ত্রী ও পাঁচ বছরের এক কন্যাকে নিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর সুচনা কমিউনিটি সেন্টারের পেছনে ভাড়া নিয়ে একটি ফ্লাটে থাকেন। আনোয়ার শরীয়তপুর জেলার সখিপুর উপজেলার শৈয়ালকান্দির সামসুদ্দিনের ছেলে।
এক সময় শাহ আলম মোহাম্মদপুর থানায় সিভিল টিমের গাড়ির ড্রাইভারি করতেন। সেই সূত্র ধরেই এসআই আনোয়ারের সঙ্গে শাহ আলমের পরিচয়। এরপর আলাপচারিতা, বাসায় যাতায়াত। সম্পর্কের খাতিরে বাসায় যাতায়াতের সুযোগে এসআই আনোয়ারের চোখ যায় শাহ আলমের স্ত্রীর উপর।
শাহ আলমের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হন এসআই আনোয়ার। কিন্তু সব কিছু জেনেও মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছিল শাহ আলমকে।
শাহ আলম জানান, “২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়কার কথা। তখন মোহাম্মদপুর বছিলা এলাকায় চানমিয়ার গলিতে গেমসের ব্যবসা করতেন। ওই সময় শান্তা ইসলাম নুসরাত জাহানের সঙ্গে পরিচয়। এক পর্যায়ে বন্ধু থেকে প্রেমে রুপ নেয়। দুই বছর প্রেম করার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে উভয়ই পালিয়ে বিয়ে করেন।
এরপর মোহাম্মদপুর বছিলা এলাকায় বসবাস শুরু করেন। সিটিসেল কোম্পানির ড্রাইভার শান্তার বাবা জলিল অনেক দিন পর মেয়ের বিয়ে মেনে নেন।
শাহ আলম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দীর্ঘদিন যাবত সংসার চলছিলো। আড়াই বছরের একটি কন্যা সন্তানও আছে তার ঘরে। মাঝখানে এসে সবকিছু পাল্টে দেয় এসআই আনোয়ার।
২০১৩ সালের শুরুর দিকে শাহ আলম গাড়ি চালাতে মোহাম্মদপুর থানায় আসেন। তাকে রেখে এসআই আনোয়ার শাহ আলমের বাসায় যায়। টের পেয়ে পিছু নেয় শাহ আলম। বাসায় গিয়ে দেখেন স্ত্রী শান্তা ও এসআই আনোয়ারের অপ্রীতিকর অবস্থা। এর আগেও অনেক কিছু টের পেয়েছিলো কিন্তু প্রতিবাদ সাহস হয়নি। যেমন একদিন মোবাইলের ম্যাসেস দেখে ফেলেছিলো। লেখা ছিলো-‘জান তুমি খেয়েছো। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আজ রাতে দেখা করবো।’
পঙ্গু হাসপাতালের বেডে শুয়ে শাহ আলম জানান, ওই ঘটনার পর এসআই আনোয়ার ও শান্তার যোগ সাজসে শাহ আলমকে একটি পেন্ডিং অস্ত্র মামলায় আসামী করা হয়। এ মামলার পর আমার নিজের একটি সিএনজি ছিলো। সেটা দখল করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। শান্তা এক সময় আনোয়ারের পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে একদিন শাহ আলম মারধর করেন শান্তাকে। মারধরের ঘটনায় শান্তা এসআই আনোয়ারের বুদ্ধিমত যৌতুক মামলা করেন। এ মামলায় শাহ আলম জেল যান। এক মাস জেল খাটার পর জামিনে বের হন। বের হয়ে জানতে পারেন, শান্তা তার সংসারে আর ফিরে আসবেন না। ডিভোর্স চাইলেও গড়িমসি করেন।
গত দেড় বছর হলো শান্তা মেয়ে বাচ্চাকে নিয়ে একাই থাকেন। এসময়ের মধ্যে শাহ আলম মীমাংসার মাধ্যমে বউ-বাচ্চাকে নিয়ে আসার জন্য অনেক জায়গায় দেন দরবার করেন। কিন্তু কোনো ফল পাননি। এরই মধ্যে শাহ আলম জানতে পারেন, এসআই আনোয়ার ও শান্তা মিলে বছিলা এলাকায় আরশিনগরে একটি ছয়তলা বাসার চারতলা ভাড়া নিয়েছেন। সেখানে তারা দুজনে মিলে থাকেন। শাহ আলম খোঁজ পেয়ে ওই বাসায় যান এবং তাদের দেখতে পান। পরে এলাকার একাধিত লোকও বিষয়টি অবগত করেন তাকে।
গত রোববার রাতে এসআই আনোয়ারের সোর্স সিরাজ শাহ আলমকে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সামনে ডাকে। এসআই আনোয়ারের স্ত্রী তানজিলার সঙ্গে এ বিষয়ে বলে একটা মীমাংসা করে দেবেন। রাত সাড়ে নয়টার দিকে সরল মনে শাহ আলম সেখানে যায়। পরে সিরাজ তাকে নিয়ে সুচনা কমিউনিটি হলের কাছে যায়। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করা এসআই আনোয়ার ও কয়েকজন পুলিশের সদস্য মিলে তাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নেন। কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা তিনি বুঝতে না পারলেও ফোনে শুনেছেন, তালতলা ঝিলপাড়। এসআই আনোয়ার ফোনে বলছিলেন, একটা গামছা দিয়ে চোখ বাঁধা হয়েছে, আরেকটা গামছা নিয়ে আয় মুখ বাঁধার জন্য। এর কিছুক্ষণ পরেই রাত সাড়ে ১২টায় শাহ আলমের দুই পায়ে পিস্তল ও শর্টগান দিয়ে গুলি করেন।
এরপর উল্টো তাকে আসামী করে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি ছিনতাই মামলা করেন। পরে শাহ আলম তেজগাঁও জোনের উপ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারকে বিষয়টি জানালে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে প্রাথমিকভাবে গুলির ঘটনা সাজানো নাটক প্রমাণিত হলে এসআই আনোয়ারকে গ্রেফতার ও ওসি আব্দুল মোমেনকে প্রত্যাহার করা হয়।
বছিলার আরশিনগরে ভাড়াকৃত বাসার মালিক ইউসুফ মোল্লা জানান, এসআই আনোয়ার ও শান্তা স্বামী স্ত্রী পরিচয়ে মাসিক ৮ হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নেয়।
শেরেবাংলা নগর থানার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এসআই জানান, এসআই আনোয়ার গত সাত বছর আগে এসআই পদে চাকরি নেন। এক নাগাড়ে তিন বছর মোহাম্মদপুর থানায় দায়িত্ব পালন করায় সেখানকার অপরাধ জগত কন্ট্রোল করতেন। তার আচার-আচরণও ভালো ছিলো না। তবে তার কারণে একজন ভালো মানের ওসিকেও প্রত্যাহার করা হলো।
এ ব্যাপারে শেরেবাংলা থানার নতুন ওসি গণেষ গোপাল বিশ্বাস টাইমনিউজবিডিকে জানান, শাহ আলমের ভাই গোলাম মোস্তফার দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে এসআই আনোয়ারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওসি আব্দুল মোমেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত গভীরভাবে চলছে, শেষ হলেই খুব দ্রুত চার্জশিট প্রদান করা হবে।
দুই দিনের রিমান্ডে এসআই আনোয়ার শাহ আলমের পায়ে গুলি করে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা সাজানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার পুলিশ এইআই আনোয়ার হোসেনকে দুই দিনের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে আদালত।
গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির বৃহস্পতিবার আনোয়ারকে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করে সাতদিনের হেফাজতের (রিমান্ড) আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম মারুফ হোসেন দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শুনানিতে আনোয়ারের পক্ষে রিমান্ডের বিরোধিতা করেন আইনজীবী মল্লিক শফিউদ্দিন।
তবে আসামির পক্ষে কোনো জামিন আবেদন ছিল না বলে জানান আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, “গুলিতে আহত পুলিশের গাড়িচালক ও সোর্স শাহ আলমের বিরুদ্ধে কয়েকটি থানায় অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য এস আই আনোয়ার হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া জরুরি।”
পুলিশের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, “আমি ঘটনা জানার পর ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করেছি। শাহ আলমকে গুলি করে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা সাজানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।” শাহ আলম বর্তমানে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জেইউ, জেএ





