মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান। এ সময় গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত রোহিঙ্গাবিষয়ক বিবৃতির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানানো হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক নয়। এসব তথ্যের বড় অংশই ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা জাতিসংঘ ব্যবস্থায় নিবন্ধিত তথ্যের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানায় ঢাকা।

বাংলাদেশ আরও জানায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি ও সমঝোতাকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব চুক্তির আলোকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

ঢাকার পক্ষ থেকে বিশেষভাবে বলা হয়, ২০১৭ সালের পর রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি শরণার্থীশিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও যাচাই প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে। কারণ, এসব শিশুর জন্ম বাংলাদেশে হলেও তাদের পরিবার মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য যাচাইয়ের হিসাবের বাইরে থাকা অতিরিক্ত নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের তথ্যও যথাসময়ে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে ঢাকা।

বৈঠকে রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক নয়। তারা নিজস্ব জাতিগত পরিচয়সম্পন্ন একটি জনগোষ্ঠী। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষও সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের এই জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য তাদের নিজস্ব পরিচয় ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করায় দেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। তাই প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াকে বাস্তব অগ্রগতির দিকে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানানো হয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ মিয়ানমার সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সোয়ে মো। তিনি জানান, যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচাইকৃত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে তার সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ফলে নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর থেকে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে তারা বসবাস করছে। সময়ের সঙ্গে শরণার্থীশিবিরে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের আকারও ক্রমেই জটিল হচ্ছে।

বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের আগে রাখাইনে নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলে আসছে ঢাকা।

সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবারের বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, প্রত্যাবাসনের জন্য কারা যোগ্য এবং কতসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে—এ দুটি বিষয়ই প্রক্রিয়াটির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

বাংলাদেশের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে জাতিসংঘের নিবন্ধিত তথ্যকে ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে। পাশাপাশি ২০১৭ সালের পর মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা এবং শরণার্থীশিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুদের তথ্যও যাচাইয়ের আওতায় আনতে হবে।

মঙ্গলবারের বৈঠকে দুই দেশের অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের বক্তব্যের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে দ্রুত যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং প্রত্যাবাসন শুরুর আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত যাচাই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে তার সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছেন।

তবে দীর্ঘদিনের এই সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপরই সংকট সমাধানের অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

এমএম