বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) শুনানি চলাকালে লতিফ সিদ্দিকী আদালতে এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘ফাঁসি দিয়ে দেন, আমার মৃত্যুতে সহায়তা করুন।’

এক পর্যায়ে তিনি আদালতকে পক্ষপাতদুষ্ট বলেও মন্তব্য করেন এবং কর্তব্যরত পুলিশের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।

দুপুর পৌনে ২টার পর ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল তাকে কারাগারে পাঠানোর এই আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

এ মামলার ৪১ জন আসামির তালিকায় লতিফ সিদ্দিকীর নাম রয়েছে ১০ নম্বরে। এদিন দুপুর ১টার পর ডিবির মাইক্রোবাসে করে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম লতিফ সিদ্দিকীকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন। অন্যদিকে লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে ওকালতনামায় স্বাক্ষর ও ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় কথা বলার অনুমতি চান তার আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হারুন ভুঁইয়া রাসেল। প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম এই আবেদনের সমর্থন জানালে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন।

শুনানি চলাকালে লতিফ সিদ্দিকী নিজে আদালতের কাছে কথা বলার অনুমতি প্রার্থনা করেন। ট্রাইব্যুনালের কাচঘেরা ডকে থাকা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি কয়েকবার বলেন, ‘আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ তবে ট্রাইব্যুনাল তার এই আবেদনে সাড়া দেয়নি।

এ সময় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান আসামিপক্ষের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, আইনে আসামির সরাসরি কথা বলার সুযোগ আছে কি না। লতিফ সিদ্দিকী বারবার কথা বলার চেষ্টা করলে চেয়ারম্যান অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘কে এলাউ (অনুমতি) করছে উনাকে? আস্কড হিম টু স্টপ।’ এরপর ডকের মাইক্রোফোনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কথা বলার সুযোগ না পেয়ে লতিফ সিদ্দিকী আক্ষেপ করে বলেন, ‘হায়রে, এই যদি হয় আদালত তাহলে আমি কোথায় যাই।’

এ পর্যায়ে শুনানি শেষে তিন বিচারক এজলাস ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় লতিফ সিদ্দিকী কাঠগড়ার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। পুলিশ সদস্যরা তাকে হাজতখানায় নেওয়ার জন্য এগিয়ে এলে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পুলিশ তাকে বসতে বললে তিনি উচ্চস্বরে বলেন, ‘আমি বসে থাকবো নাকি দাঁড়িয়ে থাকবো সেটা আমার বিষয়। তোমরা বলার কে?’ এসময় লতিফ সিদ্দিকীকে পুলিশের সাথে তর্ক করতে দেখা যায়।

পরে তার আইনজীবীরা ডকের কাছে জড়ো হন এবং পুলিশের সাথে লতিফ সিদ্দিকী ও আইনজীবীদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।

আইনজীবীরা কর্তব্যরত পুলিশের বিরুদ্ধে গায়ে হাত তোলার অভিযোগও করেন। পরে এজলাসে উপস্থিত লতিফ সিদ্দিকীর ভাই বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এগিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

পরে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে পুলিশ তাকে এজলাস থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় লতিফ সিদ্দিকী আবারও বলতে থাকেন, ‘আদালতকে বলতে চাইলাম ফাঁসি দিয়ে দেন, আমার মৃত্যুতে সহায়তা করুণ। আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আদালত শুনতে চাইল না।’

এর আগে শাপলা চত্বরের ঘটনার মামলায় লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় বুধবার (২৯ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত ২৭ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে এই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ১০ জনকে হাজিরের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একইসঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়।

এই মামলায় লতিফ সিদ্দিকীসহ এখন পর্যন্ত মোট ১১জন গ্রেফতার রয়েছেন। অন্য গ্রেফতারকৃতরা হলেন— সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মন্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবু। এছাড়া সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও আবদুর রাজ্জাক অন্য মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় দুটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে অভিযান চলাকালে ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা এবং দ্বিতীয় অভিযোগে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ২০ জনকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব ঘটনা ‘গণহত্যা, হত্যা, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্যভিত্তিক নিপীড়ন’, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের অধীনে বিচারযোগ্য।

এমএম