প্রায় ৭০ বছর আগে বিয়ের পর থেকেই পৈতৃক ভিটায় সংসার করছেন সাজু ও নুরজাহান। কাঁচামালের ব্যবসা করে সীমিত আয়ে ছয় সন্তান—তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে বড় করেছেন। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। ছেলেদেরও কেউ নিখোঁজ, কেউ ঢাকায় রিকশা চালান। শেরপুরে থাকা ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে নিজের সংসারের পাশাপাশি যতটা সম্ভব বাবা-মায়ের খোঁজ রাখেন।

তবে নূর ইসলামের সংসারেও অভাব রয়েছে। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রী চিকিৎসার অভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে অসুস্থ মা-বাবার নিয়মিত ভরণপোষণ করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রায় পাঁচ বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নুরজাহানের। এরপর থেকেই তিনি শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। একই সময়ে বয়সের ভারে সাজু শেখও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ঠিকমতো সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না, কানে কম শোনেন। কিন্তু স্ত্রীর সেবা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।

প্রতিদিন সকালে কষ্ট করে স্ত্রীকে কোলে তুলে ঘরের বাইরের উঠানে চটি বিছিয়ে শুইয়ে দেন সাজু। এরপর পাশে বসে থাকেন দীর্ঘ সময়। স্ত্রীর দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন। ভাঙা শরীর নিয়েও ৮৬ বছর বয়সে এভাবেই স্ত্রীকে আগলে রেখেছেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, সংসারের খরচ চালাতে মাঝে মাঝে খুনুয়া বাজারে কাজের সন্ধানে যান সাজু শেখ। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা দেখে কেউ কাজ দিতে চান না। কিছুক্ষণ পরই তিনি ফিরে আসেন স্ত্রীর কাছে।

অসহায় এই বৃদ্ধ কখনো কখনো কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন—তাদের দুজনকে যেন একসঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়।

সম্প্রতি স্ত্রীকে কোলে নিয়ে ঘরের বাইরে বসে এমনই কষ্টের কথা বলছিলেন সাজু শেখ। তার কান্নাজড়িত সেই মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফেসবুকে প্রকাশ করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বিষয়টি শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের নজরে আসে। পরে তার নির্দেশে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান ওই দম্পতির বাড়িতে যান।

তারা বৃদ্ধ দম্পতির জন্য দুই মাসের খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, কম্বল ও নগদ অর্থ দিয়ে আসেন। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক প্রতি মাসে তাদের খাবারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান। ছেলে নূর ইসলামকে প্রতি মাসে ইউএনও কার্যালয়ে গিয়ে মা-বাবার জন্য খাদ্যসামগ্রী নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রয়োজনে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও সহযোগিতা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্ত সৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও সাজু শেখ ও নুরজাহানের জন্য খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

অভাব তাদের জীবনকে কঠিন করে তুললেও প্রায় ৭০ বছরের এই দাম্পত্যে একে অপরের প্রতি নির্ভরতা ও মমতাই যেন এখন সবচেয়ে বড় সম্বল হয়ে আছে।

এস