প্রস্তাবিত বাজেটে মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপ করা হলেও চূড়ান্ত বাজেটে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এ ঘোষণায় বড় উত্থান দিয়ে গেল সপ্তাহে লেনদেন শুরু হয় শেয়ারবাজারে। প্রথম কার্যদিবসে উল্লেখযোগ্য হারে সূচক বাড়লেও শেষ তিন কার্যদিবসে টানা পতন দেখা গেছে। পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণীর বড় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকায় শেয়ারবাজারে স্থিতিবস্থা কাটছে না।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও শেয়ারবাজারে নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছে না। এ অবস্থায় ব্যক্তিশ্রেণীর বড় বিনিয়োগকারীরাও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারী নির্ভর হয়ে পড়ছে শেয়ারবাজার।

বড় বিনিয়োগকারীর সংকটে ধারাবাহিকভাবে লেনদেন কমে একটি সীমায় আটকে গেছে। গেল সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৩২১ কোটি টাকায়, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেশি। তবে সপ্তাহ শেষে সার্বিকভাবে দেশের উভয় শেয়ারবাজারে মূল্যসূচকে পয়েন্ট যোগ হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজেট মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপ প্রত্যাহার ও ৩০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিকে ১০ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে জুন ক্লোজিংয়ে বাজারে শেষ তিন কার্যদিবসে কিছুটা বিক্রি চাপ ছিল। এতে এ তিন কার্যদিবসে পয়েন্ট হারায় সূচক।

সপ্তাহ শেষে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) গেল সপ্তাহে ব্রড ইনডেক্স যোগ হয়েছে ২৬ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট। অন্যদিকে দেশের অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচকে যোগ হয়েছে ৭৪ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট।

অন্যদিকে জুনে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির অর্ধবাষিক ও প্রান্তিকের হিসাব শেষ হয়। এতে কোম্পানিগুলো জুন শেষে মুনাফা কেমন হয়-এ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন অনেক বিনিয়োগকারী। পুঁজির নিরাপত্তায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ করছেন। এতে মুনাফা হলেই তা তুলে নেয়ার জন্য শেয়ার বিক্রি করছেন তারা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অতিরিক্ত বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া পদক্ষেপের কারণেই শেয়ারবাজারে লেনদেন কমে যেতে শুরু করে।
শেয়ারবাজারের বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো লেনদেন বাড়াতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করত। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে অতিরিক্ত বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতায় বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নতুন তরে বিনিয়োগ করতে পারছে না।

বরং বিনিয়োগ সমন্বয়ের অংশ হিসেবে নিয়মিতভাবে শেয়ার বিক্রি করতে হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানকে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের অংশগ্রহণ না থাকায় ব্যক্তিশ্রেণীর বড় বিনিয়োগকারীরাও সাইডলাইনে চলে গেছেন। এছাড়া মার্জিন ঋণ সংকটের কারণে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো লেনদেনে অংশগ্রহণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

ডিএসইতে গেল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার মূল্যসূচক বাড়ে ৭৭ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট। এদিন লেনদেন হয় ৩৯০ কোটি টাকা। পরের কার্যদিবসে সূচক কমে ৬ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট, এদিন লেনদেন হয় ৩৮৭ কোটি টাকা। বুধবার ডিএসইতে সূচক কমে ১৩ দশমিক ৯ পয়েন্ট। এদিন লেনদেন হয় ২৪৭ কোটি টাকা। শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার ডিএসইতে সূচক কমে ৩০ দশমিক ৪১ পয়েন্ট। এদিন লেনদেন হয় ২৬২ কোটি টাকা।

ডিএসইতে গেল সপ্তাহে ৩০৫টি কোম্পানির মোট ৩২ কোটি ৬ লাখ ৮২ হাজার ৬৪৪টি সিকিউরিটিজের লেনদেন হয়। যার বাজারদর ছিল ১২৮৭ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ১৩৭টির, কমেছে ১৪০টির ও অপরিবর্তিত ছিল ২৮টির।
ডিএসইর ব্রড ইনডেক্স আগের সপ্তাহের চেয়ে ২৬ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৩৬ দশমিক ২১ পয়েন্টে। অন্যদিকে নির্বাচিত সূচক ডিএসই-৩০ আগের সপ্তাহের চেয়ে ৫দশমিক ২৯ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬২১ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে।

দেশের অন্য শেয়ারবাজার সিএসইতে গেল সপ্তাহে ২৪৫টি কোম্পানির মোট ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার ৯৪২টি সিকিউরিটিজের লেনদেন হয়। যার বাজারদর ছিল ১০১ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ১২৫টির, কমেছে ১০৩টির ও অপরিবর্তিত ছিল ১৭টির।
সিএসইর সার্বিক সূচক আগের সপ্তাহের চেয়ে ৭৪ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬৭৮ দশমিক ৪৫ পয়েন্টে। অন্যদিকে নির্বাচিত সূচক সিএসই-৩০ আগের সপ্তাহের চেয়ে ১২৭ দশমিক ১৫ পয়েন্টে।

ডিএসইতে গেল সপ্তাহে টাকার ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলো হলো-বেক্সিমকো লিমিটেড, গ্রামীণফোন, লাফার্জ সুরমা, এ্যাপোলো ইস্পাত, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, স্কয়ার ফার্মা, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, বিএসআরএম স্টিলস ও পদ্মা অয়েল।

ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি দরবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানিগুলো হলো-ফাইন ফুডস, স্টাইল ক্রাফট, ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এ্যাপোলো ইস্পাত, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোবাকো, বেক্সিমকো লিমিটেড, বিচ হ্যাচারি ও জিবিবি পাওয়ার।

অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি দর হ্রাস পাওয়া কোম্পানিগুলো হলো-মেঘনা লাইফ, সন্ধানী লাইফ, জেমিনী সি ফুড, এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, মুন্নু স্টাফলার্স, বেক্সিমকো ফার্মা ও ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

ঢাকা, ৫ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর