বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য যখন ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছিল, তখন লিটারপ্রতি আমাদের বাজারে তেলের মূল্য ছিল ফার্নেস অয়েল ৬০ টাকা এবং ডিজেল ৬৮ টাকা। বিগত এক বছর ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দর নামতে নামতে এখন প্রতি ব্যারেল ৪০ ডলারে এসে ঠেকেছে। 

অথচ আমাদের তেলের দর ওই ৬০ টাকা ও ৬৮ টাকাই রয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ালেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহার্য গ্যাসের দাম বাড়ায়নি।

গ্যাসের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয়েছে ক্যাপটিভ পাওয়ারে। এ খাতে আগে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ছিল ৪ টাকা ১৮ পয়সা। তা বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৩৬ পয়সা। অন্যান্য শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ৮৮ পয়সা। প্রতি ঘনমিটার ৫ টাকা ৮৬ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬ টাকা ৭৪ পয়সা। আর বাণিজ্যিক ব্যবহারে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৯ টাকা ৪৭ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা। এ হিসাবে বাণিজ্যিকে গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রতি ঘনমিটারে ১ টাকা ৮৯ পয়সা।

বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র শিল্পে প্রতি ইউনিটে দাম বাড়ানো হয়েছে ২৪ পয়সা। ৭ টাকা ৪২ পয়সার বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের কিনতে হবে ৭ টাকা ৬৬ পয়সায়। বৃহৎ শিল্পে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ইউনিট প্রতি ২৪ পয়সা।

১১ কেভি ৭ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৫৭ পয়সা করা হয়েছে। বৃহৎ শিল্পে বেড়েছে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টার জন্য ২৫ পয়সা। আর বাণিজ্যিক ব্যবহারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ২২ পয়সা। এ খাতের ৯ টাকা ৫৮ পয়সার বিদ্যুতের দাম পড়বে ৯ টাকা ৮০ পয়সা।

সরকারি ও ব্যক্তি উভয় খাতেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। উভয়ের জন্য প্লেইং ফিল্ড হিসেবে বিদ্যুৎ খাত একই রকম সমতল অর্থাৎ উভয়ের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হলে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। তাতে ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা বিইআরসির আইনি দায়িত্ব।

গ্যাস স্বল্পতায় সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গড়ে ৫০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে। তার দামহার গড়ে ২ দশমিক ১৫ টাকা। গ্যাস সরবরাহে উভয়ের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা হলে সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পেত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। (গ) তাছাড়া ন্যায্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩৭৪ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল প্লান্টের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নবায়ন না করে বা রদ করে এ প্লান্টে ব্যবহূত গ্যাসে সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। সুতরাং বিইআরসি বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে আর্থিক ঘাটতি দেখিয়েছে, তা কৃত্রিম।

পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫ অর্থবছরে তাদের লাভ হয়েছে ২০ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছর বিদেশী ও দেশী কোম্পানির কাছ থেকে পেট্রোবাংলা ৭ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার গ্যাস কিনেছে। ঐ একই বছর গ্যাস বিক্রি করেছে ১১ হাজার ৫৮ কোটি টাকার। এতে লাভ হয়েছে তিন হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।
২০১২-১৩ অর্থবছরে গ্যাস কিনেছে সাত হাজার ৫৯০ কোটি টাকার আর বিক্রি করেছে ১১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা দিয়ে। লাভ হয়েছে তিন হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে গ্যাস কিনেছে ছয় হাজার ২৪৬ কোটি টাকার, বিক্রি হয়েছে ১১ হাজার ৯৫ কোটি টাকার গ্যাস। লাভ হয়েছে চার হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সরকারের এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও প্রতারণামূলক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে যার ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমেছে।

এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যে গণশুনানি করেছিল তা ছিল লোক দেখানো। সরকারের নির্দিষ্টকৃত নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় গ্যাসের সম্পদমূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় ওই মূল্যের আইনি বৈধতা নেই। গণশুনানিতে তা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে গ্রাহক পর্যায়ে এ পর্যন্ত সাত দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের মার্চ মাসে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে প্রতি ইউনিটে ৪০ পয়সা করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়।

আর পাইকারি বিদ্যুতের দাম দুই টাকা ৩৭ পয়সা থেকে ছয় দফায় ৯৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বাড়িয়ে চার টাকা ৭০ পয়সা করা হয়। পাইকারি পর্যায়ে সর্বশেষ বাড়ানো হয় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। এ ছাড়া গ্যাসের মূল্য সর্বশেষ ২০০৯ সালের আগস্টে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

সক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য কমিশন পেট্রোবাংলাকে আদেশ দেয় এবং জিডিএফের অর্থ ব্যবহারের নীতিমালা চূড়ান্ত অনুমোদন করে। সে পরিকল্পনা প্রণয়নের আদেশ প্রতিপালিত হয়নি। বরং ওই নীতিমালা অগ্রাহ্য করে জ্বালানি বিভাগ নিজেই নীতিমালা তৈরি করে জিডিএফের অবৈধ দখল নেয়। তাছাড়া গণশুনানিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত পেট্রোবাংলার প্রস্তাব মতে, কমিশনের আদেশে পরিবর্তন করে লেখা হয় এবং সে মতো সিএনজির দামহার বৃদ্ধির বর্ধিত অর্থের সিংহভাগ সরকার ও পেট্রোবাংলার মধ্যে বিলি-বণ্টন হচ্ছে।

গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে রফতানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে খাতটিতে।

রফতানিমুখী শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরই মধ্যে প্রতিদ্বন্ধি দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি। দেশগুলো যেখানে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি করছে আমাদের সেখানে নেতিবাচক।

দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো নয়। রফতানি আয়ে মন্দা চলছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে উদ্যোক্তারা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। এ ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই বিনিয়োগে আসতে চাইবেন না। ফলে নিরুৎসাহিত হবে বেসরকারি খাত। এ কারণে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিকে বিনিয়োগবিরোধী সিদ্ধান্ত বলছেন অনেকেই।

এদিকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ম. তামিম বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম বেড়েছিল তখন সরকার দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে আগে থেকেই একটি চূড়ায় নিয়ে গেছে। কিন্তু এখন বিশ্ববাজারে দাম কমলেও বিদ্যুতের দাম না কমিয়ে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অর্থহীন।’
বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের বাজারসহ সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতির ঘটবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

জনজীবনে ক্রমাগত দুর্ভোগ বাড়াতে আবারও গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা এলো বলে মন্তব্য করেছেন সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘সরকার অযৌক্তিকভাবে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা জনগণের দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেবে।’

সাধারণ মানুষ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় দেশে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম কমার আশা করেছিল মানুষ। এ অবস্থায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে কার্যত জন-আকাঙ্খার বিপরীত প্রতিফলন ঘটেছে।

তারপরও তারা আশা প্রকাশ করে বলেন, সার্বিক দিক বিবেচনা করে সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। সেই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রাখবে।

এমএ