রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দীর্ঘদিন বাজারে নেতিবাচক পরিস্থিতি ছিল। তবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের পর লেনদেন বাড়ছিল। সূচকও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু দেড় মাস ধরে আবারও বাজারে ভাটার টান দেখা দিয়েছে। টানা সূচক ও দরপতন, লেনদেন কমা যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকের উত্থানের বাজার এখন পতনের গহব্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। বাজারকে টেনে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপও কাজে আসছে না। এমনকি স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথককরণ (ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন) করেও বাজার ফিরছে না, বরং ক্রমেই পতনের ধারায় থাকছে। একই সঙ্গে বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা এবং আস্থাহীনতার ভাব দেখা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বাজার নিয়ে গত কিছুদিন আমি তেমন ভাবিনি। তবে এতোটুকু বলতে পারি যে, গত কিছুদিনে যেসব কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে তার বেশিরভাগই বিনিয়োগকারীদের কাছে মনঃপূত হয়নি। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বৃদ্ধিও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে থাকতে পারে বলে আমার মনে হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ একেবারেই কমে গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গন নিয়েও বিনিয়োগকারীরা ততটা আশাবাদী নন। এসব বিষয় বাজারকে প্রভাবিত করছে। শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সার্কুলারও বাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী বলে অনেকেই মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের এমডি সাজিদ হোসেন বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, বিশেষত ব্যাংক এবং ব্যাংকের সহযোগী মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে এখন লেনদেন নেই বললেই চলে।
গেল জানুয়ারিতে শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবগুলো ব্যাংকের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। এর প্রভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যায়। শেয়ারের দরপতনের কারণে লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বছরের শুরুর দিকে ডিএসইএক্স সূচক চার হাজার ২৯৬ পয়েন্ট থেকে গত ৬ ফেব্রুয়ারি তা চার হাজার ৮৪৫ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠেছিল। তবে সর্বশেষ ১২ মার্চ থেকে আবার সূচক টানা পতনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। মূলত গত এক মাসের পতনেই বিনিয়োগকারীদের মনে বড় ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন পরবর্তী ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দেড় মাসের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৪৭৬৩ পয়েন্ট, শরিয়া সূচক ৯৯৬ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১৬৯৩ পয়েন্ট। গতকাল ১৯ মার্চ শেষে ডিএসইএক্স সূচক ৪৫১৯ পয়েন্ট, ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সূচক ৯৮৪ পয়েন্টে ও ডিএস-৩০ মূল্য সূচক ১৬২৪ পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জটিতে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে ৬৪৬ কোটি এবং সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে ২৯২ কোটি টাকা।
এদিকে স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথককরণ (ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন) পরবর্তী নতুন পর্ষদের দায়িত্বভার নেয়ার পর বাজারে লেনদেন ও সূচক ছন্দপতনে রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমান বলেন, বেশ কিছুদিন বাজারে লেনদেন ও সূচক ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। উভয় বাজারে একদিকে বাজার মূলধন কম অন্যদিকে বাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশন ও বিএসইসির মধ্যে চরম সম্মনয়হীনতা রয়েছে। তাছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার নিয়ে ব্যাংকগুলোর প্রতি নজরদারি বৃদ্ধি করায় এমনটি হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ২০১০ সালে বাজারের যে মূলধন ছিলো বর্তমানে তার অর্ধেকে নেমেছে। বাজারে এ ধরনের আচরণ অনেক দিন থেকে হয়ে আসছে। কিন্তু তার কোনো সমাধান করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, শুনেছি বিএসইসিতে সার্ভিলেন্ট সফটওয়ার চালু হয়েছে। কিন্তু তার কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।
একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের কারসাজিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় বারবার একই ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলো স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন পরবর্তী বাজার ভালো হবে। কিন্তু নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেয়ার পর তারা হতাশ ও আস্থাহীনতায় পড়েছে। কারণ নতুন পর্ষদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে ধারণা কম। তারা বাজার ভালো করতে পারবে বলে আমি নিজেও যথেষ্ট সন্দিহানে রয়েছি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
[b]ঢাকা, ২০ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর[/b]
অর্থনীতি
ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশনেও ঠেকানো যাচ্ছে না পুঁজিবাজারের ছন্দ পতন
রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দীর্ঘদিন বাজারে নেতিবাচক পরিস্থিতি ছিল। তবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের পর লেনদেন বাড়ছিল। সূচকও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু দেড় মাস ধরে আবারও বাজারে ভাটার টান দেখা দিয়েছে। টানা সূচক ও দরপতন, লেনদেন কমা যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে দাঁড়িয়েছে।





