দেশি-বিদেশি নয় ব্যাংক ১১ হাজার ৯৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ১০ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাসেল-২ অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সোনালী ও রূপালী ব্যাংক। বিশেষায়িত খাতের বেসিক, বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। বেসরকারি খাতের তিন ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক। আর বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বেসিক, কৃষি ও সোনালী ব্যাংকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়েছে। তিন মাসে সোনালী ব্যাংকে এক হাজার ২৩২ কোটি ৮৮ লাখ ও বেসিক ব্যাংকে ৬৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মূলধন ঘাটতি বেড়েছে।
ব্যাংক খাতে হলমার্ক, বিসমিল্লাহর মতো বড় ঋণে অনিয়ম যেমন হয়েছে, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে ছোট ছোট অনেক অনিয়মও হয়েছে। এসব অর্থ কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির কারণে ব্যাংকগুলোতে ঝুঁকিনির্ভর সম্পদের পরিমাণ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালের জুন শেষে রাষ্ট্রীয় খাতের চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ১০ হাজার ৬৯২ কোটি ৩২ লাখ টাকা প্রয়োজনীয় মূলধন হিসেবে রাখার কথা থাকলেও এ সময়ে ব্যাংকগুলো মূলধন সংরক্ষণ করেছে নয় হাজার ২৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সে হিসেবে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪৪১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বা ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
এর আগে মার্চ শেষে রাষ্ট্রীয় খাতের চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২৪০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল তিন হাজার ৫৩৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটির রয়েছে এক হাজার ১৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যাংকটিতে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এর আগে মার্চে এর পরিমাণ ছিল ২৭৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
রূপালী ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল এক হাজার ২৬৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটির রয়েছে ৭৬৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যাংকটিতে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর আগে মার্চে ঘাটতি ছিল ২৭৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
তবে রাষ্ট্রীয় খাতের বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে তিন হাজার ১৮৫ কোটি ৩৭ টাকা সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও এ সময়ে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ঋণাত্মক (-) চার হাজার ৩৩৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে (-) সাত হাজার ৫২৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। মার্চ শেষে এটা ছিল ছয় হাজার ৭৬২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
আলোচ্য সময়ে বেসিক ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল এক হাজার ৬৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটির রয়েছে ঋণাত্মক (-) ৬১১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যাংকটিতে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৭৫ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। মার্চে এর পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল এক হাজার ২৬০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটির রয়েছে ঋণাত্মক (-) চার হাজার ৭৩৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যাংকটিতে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৯৮৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মার্চে যা ছিল পাঁচ হাজার ৮০৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৬৪৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে ব্যাংকটির মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটির রয়েছে ঋণাত্মক (-) ২৪৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর জন্য মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এসব ব্যাংকের মূলধন রয়েছে ৫০ হাজার ১৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সে হিসেবে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত মূলধন দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৩২০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৪০ কোটি তিন লাখ, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের এক হাজার ৪১৫ কোটি ৮৫ লাখ ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর পাঁচ হাজার ৮৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা প্রয়োজনীয় মূলধন হিসেবে রাখার কথা থাকলেও আলোচ্য সময়ে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে আট হাজার ৬৩৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৭৯৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
একমাত্র ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ৩৬৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন ’১৪ শেষে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৬৪ হাজার ৫৪২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর রয়েছে ৬৩ হাজার ৬৯৪ কোটি চার লাখ টাকা। সে হিসেবে ২০১৪ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৮৪৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। মার্চ শেষে মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল দুই হাজার ৩৭৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বা ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। সে হিসেবে তিন মাসে ঝুঁকির উদ্বৃত্ত কমেছে ৫২৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানার অনেক ব্যাংক বিনিয়োগের গুণগত মান যাচাই-বাছাই না করেই নানা প্রেক্ষাপটের কারণে ঋণ বিতরণ করেছে, যা পরবর্তীতে ব্যাংকের জন্য বোঝা হয়ে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে। এর সামগ্রিক প্রভাব ব্যাংকের সংরক্ষিত মূলধন ঘাটতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তবে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগকারী কি না তা যাচাই করে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ কমিয়ে এবং পরিচালন মুনাফা বাড়িয়ে এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তা ছাড়া যেসব ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে পারেনি, তাদের চিঠি দিয়ে পরবর্তী প্রান্তিকের মধ্যে পূরণ করার নির্দেশ দেয়া হবে বলে তিনি জানান।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, সামগ্রিক বিবেচনায় ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করেছে, তা আগের তুলনায় ভালো। ব্যাংকের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় ন্যূনতম মাত্রার চেয়ে বেশি হারে মূলধন সংরক্ষণ করা উচিত। কারণ ঝুঁকি মোকাবিলায় যে কোনো ব্যাংকের উচ্চ মূলধন থাকা জরুরি। কেননা এর আগে শুধু ঋণ ঝুঁকির বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে বলা হতো। বর্তমানে ঋণ, বাজার ও পরিচালন ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। তাই বর্তমানে ব্যাংকগুলো আগের থেকে ভালো অবস্থানে আছে বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা, ২৯ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর





