বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০১ কোটি ডলার চুরি গেল আর তা জনগণ জানতে পারলো প্রায় দেড় মাস পর! এমনকি বিষয়টা অর্থ মন্ত্রণালয়কেও জানায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কাউকে না জানালেও কিছু টাকা উদ্ধারের সফলতা দাবি এবং বাকিটাও উদ্ধারের আশার বাণী শুনিয়েছেন তারা। নিজেদের বুদ্ধিতে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ রাকেশ আস্তানা ও তার প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ফায়ার আইকে এর তদন্ত ভার দিয়েছেন। এমনকি ওই প্রযুক্তিবিদের পরামর্শে গভর্নরের মৌখিক নির্দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবক’টি কম্পিউটারে নতুন করে অ্যান্টি ম্যালওয়্যার সফটওয়্যার ইনস্টল দেয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যান অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম। সেখানে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মো. রাজি হাসানের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

এরকম একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ভয়ঙ্কর গোপনীয়তা রক্ষার হেতু জানতে পারেনি কেউ। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছে উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

বৈঠক শেষে আসলাম আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনা ঘটার পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে

অর্থ মন্ত্রণালয়কে কিছু জানানো হয়নি। ২৩ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করা হয়নি এবং কোনো আলোচনাতেও আনেনি। অডিট কমিটির দুটি মিটিং এ আমি ছিলাম সেখানেও বিষয়টি আলোচনা করা হয়নি।’

কেন অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হলো না, এতোটা গোপনীয়তা রক্ষা করা হলো কেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘তারা এখন বলছে তারা তদন্ত করে পুরো বিষয়টি জানাবে। কিন্তু আমি তো মনে করি আমাদের বিষয়টি জানানোর প্রয়োজন ছিল। এতে মন্ত্রণালয় সন্তুষ্ট নয়।’

তিনি জানান, অবশেষে আজ বিষয়টি জানতে এসেছেন। তথ্য উপাত্ত নিয়ে গেলেন। রিপোর্ট তৈরি করে অর্থমন্ত্রীকে জানাবেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার প্রথম বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক দিন পর জানতে পারে বাংলাদেশের গণমাধ্যম। ৬ মার্চ বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর ৭ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিবৃতি দেয়, ঘটনাটি ঘটেছে গত ৫ ফেব্রুয়ারি। সন্দেহজনক লেনদেন টের পেয়ে মার্কিন ফেডারেল ব্যাংক বার্তা পাঠিয়েছিল কিন্তু সরকারি ছুটির ফাঁদে পড়ায় কোনো প্রত্যুত্তর পাঠানো যায়নি। আর এর মধ্যে টাকা স্থানান্তর হয়ে যায়। এর মধ্যে তারা শ্রীলংকায় যাওয়া ২০ কোটি ডলার উদ্ধার করেছেন। আর ফিলিপাইনের একটি ব্যাংকের পাঁচটি অ্যাকাউন্টে গেছে বাকি ৮১ কোটি ডলার। কিন্তু বিষয়টি এতো দেরিতে কেন জানানো হলো তার কোনো ব্যাখ্যা তারা তখন দেননি।

এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছে তা পরিষ্কার হলো গতকাল শনিবার। এদিন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বাংলামেইলকে জানায়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি নয়, চুরির ঘটনা ঘটেছে গত ২৪ জানুয়ারি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি গোপন করেছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজম্যান্ট ও অ্যাকাউটেন্স অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ দু’টি বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত। ওই দুই বিভাগ দেখাশোনায় মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকও রয়েছেন। সার্বক্ষণিক এ কাজ করার জন্য তাদের বাড়তি সুবিধাও দেয়া হয়। তাহলে ছুটির দিনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার যে যুক্তি দেয়া হচ্ছে তা অবান্তর।

এদিকে জনগণের এতোগুলো টাকা চুরি যাওয়ার খবর জেনেও এশিয়ার অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও ভারত সরকার আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে গেছেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। পাঁচ দিনের সফরে তিনি এখন দিল্লিতে। ১০ মার্চ তার দেশে ফেরার কথা ছিল।

তবে রোববার সচিব আসলাম আলম জানালেন, আগামীকাল সোমবার (১৪ মার্চ) হয়তো গভর্নর দেশে আসতে পারেন। পরদিনই জরুরি ভিত্তিতে বোর্ড সভা ডাকতে বলা হয়েছে তাদেরকে। সেখানে কেন অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে।

অবশ্য দিল্লিতেই গভর্নর সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ও ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। শিগগিরই ভালো খবর পাওয়া যাবে।

বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা চুরির বিষয়ে কতটুকু জানিয়েছে জানতে চাইলে সচিব বলেন, রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থের ৮ কোটি ৯ লাখ ৩২ হাজার ডলার ফিলিপাইনে গেছে। এর মধ্যে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কর্তৃপক্ষ সে দেশের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের ছয়টি হিসাব জব্দ করেছে। ৬৮ হাজার ডলার এসব হিসাবে রয়ে গেছে। আর ৮ কোটি ৯ লাখ ৩২ হাজার ডলারের হদিস মিলছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তিগত (আইটি) দুর্বলতার কারণে এতো টাকা চুরি গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এআইজে