ঋণের বোঝা নিয়ে চিন্তিত ভারতের করপোরেটরা। মে মাসের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির বিজয়ে শেয়ারবাজারের চাঙ্গাভাবের সময় এ দুশ্চিন্তা কমানোর একটি মোক্ষম সুযোগ ছিল তাদের জন্য। রিলায়েন্স গ্রুপের অনিল আম্বানির মতো বিচক্ষণ কয়েকজন উদ্যোক্তা বাজারের ঊর্ধ্বগতিকে কাজে লাগিয়ে মূলধন সংগ্রহ করে ঋণের বোঝা কমিয়ে আনলেও অধিকাংশই বাজারের সংশোধন পর্বে এসে হতাশ হয়েছেন।
মোদির বিজয়ের দুই সপ্তাহ পরই বাজার থেকে ঋণগ্রস্ত রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্সের জন্য ৮০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছেন আম্বানি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অভিজ্ঞ আম্বানি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, মুম্বাইয়ের শেয়ারবাজারে নির্বাচন-পরবর্তী আশাবাদ দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
আম্বানির প্রতিযোগীদের অনেকেই শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে মূলধন-ঋণ অনুপাত নামিয়ে আনতে চাইছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধীরপ্রবৃদ্ধির কারণে তাদের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেরই আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে। গৌতম আদানির নাম এক্ষেত্রে সবার আগে বলতে হয়। শেয়ারবাজারের সাহায্য নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সচ্ছলতা ফেরানোর পরিকল্পনা করছেন এ বিলিয়নেয়ার।
কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী জোয়ারে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ কাজে না লাগিয়ে আদানির মতো অনেকেই পরবর্তীতে হতাশ হয়েছেন। মুম্বাইয়ে একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকের প্রধান সম্প্রতি বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন কিছুটা সংশয়ে।
এখনি নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, তবে করপোরেট ইন্ডিয়া সম্ভবত শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সুযোগটি হাতছাড়া করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী উত্থানের সময় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পুঁজি নিয়ে কোম্পানির ঋণের বোঝা হালকা করতে পারত আরো অনেকে।
বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ওই ব্যক্তি নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে আরো বলেন, ধারণাটি কিছুটা এমন, ঋণগ্রস্ত কোম্পানিকে উদ্ধার করছে শেয়ারবাজার। কিন্তু সবচেয়ে ভালো সময়টি সম্ভবত পেরিয়ে গেছে।
ভারতের বিষয়টি এমন নয় যে, অর্থনীতি নিয়ে হতাশা রয়েছে সবার মধ্যে, কিংবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর সংশ্লিষ্টদের আস্থা কমে গেছে। গত সপ্তাহে আঞ্চলিক নির্বাচনেও নিজেদের প্রমাণ করেছে মোদির দল।
মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি সংস্কারের মাধ্যমে গ্যাস ও ডিজেলের দাম বাড়ানো, বেসরকারি খাতকে কয়লা খনির লাইসেন্স দেয়া, অবকাঠামো উন্নয়নে ট্রিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা— সবই ব্যবসায়ীদের সমর্থন পাচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির উপাত্তগুলোয়ও উন্নতি চোখে পড়ছে।
তবে বৈশ্বিক প্রতিকূলতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে যেতে বাধ্য করছে। তহবিল ব্যবস্থাপকরা উদীয়মান বাজারে খুব বেশি ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।
ভারতের ব্যাংকিং ও করপোরেট উভয় খাতই মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। লন্ডনভিত্তিক বেদান্ত গ্রুপ, আম্বানিদের রিলায়েন্সের মতো কনগ্লোমারেটগুলো বিশাল ঋণের ফাঁদে পড়ে আছে। তুলনামূলক ছোট অনেক অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ কোম্পানির মধ্যে খুব কমই সচ্ছল আছে।
অবস্থা বিশেষ ভালো নয় ব্যাংকিং খাতেরও। ফিচ রেটিংসের হিসাবে, ২০১৮ সালের মধ্যে পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ২০০ বিলিয়ন ডলার বাড়াতে হবে মন্দ ঋণের জালে বন্দি ব্যাংকিং খাতকে।
স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান অরুন্ধতী ভট্টাচার্য বলেন, বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কারণ এসব প্রতিষ্ঠান যত দিন ব্যবসায়ে ব্যয় না বাড়াবে, তত দিন ভারতের অর্থনীতিতে সুদিন আসবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পুরনো দেনা সামলাতেই ব্যস্ত ছিল করপোরেট ইন্ডিয়া।
আশাবাদী হিসেবে পরিচিত ভট্টাচার্যও বলছেন, কমপক্ষে এক বছর লাগবে ভারতের করপোরেশনগুলোকে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো একটি সার্বিক পরিবেশ করে দিতে। এদিকে বাজারের বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে গেলে প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধারে আরো বেশি সময় লেগে যাবে।
শেয়ারবাজারে নির্বাচন-পরবর্তী উল্লম্ফনের সঙ্গে যদি সংস্কার কর্মসূচি সম্পর্কে বিনিয়োগকারী ও করপোরেট ইন্ডিয়াকে আশ্বস্ত করা যেত, তাহলে হয়তো মোদি ঋণগ্রস্ততা নিয়ে ভারতের করপোরেট খাতের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা লাঘবে সফল হতে পারতেন।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
ঢাকা, ২৩ অক্টোবর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর





