বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ ‘এননটেক্স’ এবার জনতা ব্যাংকের কাছে বিপুল ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল চেয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ ব্যাংকটি নিয়মনীতির কোনো রূপ তোয়াক্কা না করে আগে থেকেই এ প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বসে আছে, যে ঋণের বেশির ভাগই পরিশোধ করতে পারছে না গ্রুপটি। এর ফলে খেলাপিও হয়ে পড়েছে তারা। এখন আবার নতুন করে জনতা ব্যাংকের কাছে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল চেয়ে বসেছে এননট্যাক্স।
গ্রুপটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যবসায় চালিয়ে যাওয়া ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য তাদের জরুরি ভিত্তিতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এ অর্থ গ্রুপটিকে দেয়া যাবে কিনা তা নিয়ে গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেকটা গোপনে ও রুদ্ধদার কক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুস সালাম আজাদ, এননটেক্সের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুস বাদল ও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী এ বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এননটেক্স জনতা ব্যাংকের অনেক বড় ক্লায়েন্ট (গ্রাহক)। তাদের কিছু মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ভুল বোঝাবুঝি) আছে। এটা নিয়ে বৈঠক হয়েছে।
এননট্যোক্স এবং জনতা ব্যাংক কি জন্য এসেছিল প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, এননটেক্সের কমপ্ল্যাইন হলো, আমরা ওতগুলো প্ল্যান্ট চালাচ্ছি। আমি কোনো ওয়ার্কি ক্যাপিটাল পাচ্ছি না। সুতরাং আমি আমার দায় (লাইবেলিটিজ) মেটাতে পারছি না। তারপরও আমরা করে যাচ্ছি। আর ওদের (জনতা ব্যাংক) কথা হলো, তুমি (এননটেক্স) অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান করেছ। কোনোটারই ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নেই। তুমি চলছ ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের কাগজে (জনতা ব্যাংকের) তো তুমি ডিফল্টার (ঋণখেলাপি)।
দুই পক্ষের কথা শুনে কী সমাধান দেয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, নো, আমি কোনো সলিউশন দিইনি। বলেছি, তোমাদের মধ্যে আলোচনা করতে হবে। আর জনতা ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু প্রশ্ন রেখেছে। এ প্রশ্নগুলোর এরা (জনতা ব্যাংক) উত্তর দেয়নি এখনো। বলল যে, আমরা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারব। আমি বলেছি, তোমরা আগে উত্তর দাও। উত্তর দিলে পরে তোমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আলোচনায় বসবে। তখন তোমাদের প্যাকেজটা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। তিনি আরো বলেন, এননটেক্স আমি নিজেও দেখতে গিয়েছিলাম। ইট ইজ এ ফার্স্টক্লাস ইউনিট। ইউনিটটা আছে। বিষয়টা এমন না যে, ওরা টাকা মেরে চলে গেছে।
এননটেক্স প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এতে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে, এটা সত্যি। বাট একচুয়্যাল ডিফল্ট ইজ কোয়াইট স্মলার।
জানা গেছে, এননটেক্স গ্রুপকে জনতা ব্যাংক মাত্র সাড়ে ৬ বছরে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। কোনো রূপ নিয়মনীতি না মেনে ঋণ দেয়ায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দ্বিতীয় বৃহত্তম এ ব্যাংকটি বেশ বিপদে রয়েছে। কারণ এ গ্রাহক সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। ইউনুস বাদল এননটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এমডি। তারই স্বার্থসংশ্লিষ্ট ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে এ ঋণ নেয়া হয়েছে। তার মূল ব্যবসায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কাপড় উৎপাদন ও পোশাক রফতানি।
সূত্র জানায়, জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন দুই হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। এ মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কোনো একক গ্রাহককে ঋণ দেয়ার সুযোগ আছে। এ হিসাবে একক কোনো গ্রাহককে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এননটেক্স গ্রুপ ঋণ পেয়েছে জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ। সরকারের নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদই এ এই ঋণ দিয়েছে। হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর এটিকে পারস্পরিক যোগসাজশে সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে ভয়ঙ্কর কারসাজির আরেকটি বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, এটি একক ঋণের বৃহত্তম কেলেঙ্কারি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকার সময় এ অর্থ দেয়া হয়। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ বছর এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। সে সময় ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম ওরফে দীপু, টাঙ্গাইলের কালিহাতী সংসদীয় আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী যুবলীগ নেতা আবু নাসের প্রমুখ।
অভিযোগ রয়েছে, ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের এ পর্ষদের উৎসাহই ছিল বেশি। পর্ষদের সিদ্ধান্তে বারবার ঋণ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয় ইচ্ছেমতো। সূত্র: নয়া দিগন্ত।
এসএম





