এবারের ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে সাড়ে ২৪ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।  তবে এরই মধ্যে জমে উঠেছে নতুন টাকার ব্যবসা। পুরাতন ব্যবসায়ী ছাড়াও নতুন করে এ ব্যবসায় যোগ হয়েছে অনেকে। ঈদ বখশিস, যাকাত, ফিতরা দিতে লোকজন তাদের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছেন নতুন নোট। ঈদ উদযাপনের এক অনুসঙ্গ হয়েছে নতুন টাকা। প্রিয়জন বিশেষত শিশুদের হাতে নতুন টাকা তুলে দিতে চান অভিভাবকেরা। সকাল থেকে রাত অবধি বিরামহীনভাবে চলছে এ ব্যবসা।

জানা গেছে, ব্যাংক থেকে একজন ব্যক্তি একবারে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা নতুন নোট বদল করে নিতে পারবেন। যেখানে ২০ ও ১০ টাকার একটি করে, ৫ টাকার তিনটি ও ২ টাকার একটি করে বান্ডেল থাকবে। আর সঙ্গে থাকবে একশ’ পিস করে ৫, ২ ও ১ টাকার কয়েন।

নতুন টাকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে চারটি ও ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ২০টি শাখায় বিশেষ কাউন্টার খোলা হয়েছে।

গত রোজার ঈদে ২২ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি ছিলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে ঈদের আগের কর্মদিবস পর্যন্ত সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে গিয়েছিল।

জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় নতুন টাকা বের করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ঈদের এই মৌসুমে। টাকা ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিজন দৈনিক ন্যুনতম দশ হাজার টাকা বিক্রি করছেন। এতে তাদের আয় হয় দৈনিক ৮শ’ থেকে এক হাজার টাকা। ঈদে নতুন টাকার চাহিদা বাড়ায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে টাকার পসরা সাজিয়ে বিক্রেতারা বসে আছেন। ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে, সদরঘাট, গুলিস্তান হলের সামনে, ফার্মগেট, মতিঝিল ব্যাংকের উত্তর গেটে, মতিঝিলে সেনাকল্যাণ সংস্থার সামনে সবচেয়ে বড় অস্থায়ী বাজার তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চাহিদার কারণে ঈদে নতুন টাকা সরবরাহ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবছরই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে।

গত এক মাস ধরে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের কাউন্টারে নতুন টাকার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অনেককে। ঈদ যতই এগিয়ে আসছে, ব্যাংকের কাউন্টারে বাড়ছে দীর্ঘ লাইন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত নতুন টাকার চাহিদা বেড়েছে। জনসাধারণ, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ নানান পেশার লোক নতুন টাকা সংগ্রহ করতে সকাল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এসে ভিড় জমাচ্ছে। জানা যায়, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জনসাধারণ যাতে নির্বিগ্নে টাকা সংগ্রহ করতে পারে তার জন্য ক্যাশ কাউন্টারের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও জোরদার করা হয়। হয়রানি কমাতে সরকারি কর্মকর্তা, প্রবীণ পেশাজীবী এবং সাংবাদিকদের জন্য করা হয় আলাদা একটি লাইনের ব্যবস্থা। তবে অভিযোগ পাওয়া যায়, সাধারণ মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে নতুন টাকা সংগ্রহ করতে পারে না।

এদিকে গভর্নর সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, ঈদকে সামনে রেখে নতুন টাকার চাহিদা বেড়েছে। এ সময় অনেকে নতুন টাকা সংগ্রহে খুবই আগ্রহী হয়। এ সুযোগে এক শ্রেণীর দালাল ব্যাংক থেকে নতুন টাকা সংগ্রহ করে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করে। তাই দালালদের অপতৎপরতা ঠেকাতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কঠোর নজরদারি করছে এবং এক ব্যক্তি একবারে একই মূল্যমানের একশ পিসের এক বান্ডিলের বেশি টাকা বিনিময় করতে পারবেন না।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে টুল নিয়ে বসে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে টাকা ব্যবসায়ীরা। জানা যায়, এসব স্থানে দীর্ঘ দিন ধরে টাকার ব্যবসা করে আসছে কতিপয় ব্যক্তি। তারা শুধু নতুন টাকা নয়, পুরাতন ও ছেঁড়া টাকার ব্যবসাও করে। অর্থাৎ কমিশন ভিত্তিতে পুরাতন ও ছেঁড়া টাকা বদলিয়ে দেয়। স্বাভাবিক সময়ে নতুন টাকার ব্যবসা তেমন একটা চলে না। শখের বসে অনেকে সংগ্রহে রাখার জন্য নতুন টাকা নিয়ে যান। তবে বেশিরভাগ সময় চলে ভাংতি টাকার ব্যবসা।

কিন্ত প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে এর ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে। ঈদ মৌসুমে নতুন টাকার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বখশিশ বা সেলামি অথবা দান করতে নতুন টাকা কিনে নেয় লোকজন। এর ফলে জমজমাট হয়ে উঠে নতুন টাকার ব্যবসা। ভাংতি ও ছেঁড়া টাকা বদলির ব্যবসা কমে যায়।

একজন টাকা ব্যবসায়ী জানান, ঈদে নতুন টাকা পেলে সবাই আনন্দিত হয়। তারা অভিভাবক বা আত্মীয় স্বজনের কাছে নতুন টাকার আব্দার করে। নতুন টাকার আশায় ছেলে মেয়েরা ঈদে সালাম করতে আসে। এ কারনে ঈদের আগে নতুন টাকার চাহিদা আরো বেড়ে যায়।

নতুন টাকা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংবলিত নতুন এক টাকার মুদ্রা ১০০টি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। ৫০০টি দুই টাকার নতুন নোটের দাম এক হাজার ২৫ টাকা। ২০০টি পাঁচ টাকার নোট ও ১০০টি ১০ টাকার নোট বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকায়। আর ৫০টি ২০ টাকার নোট কিনতে হচ্ছে এক হাজার ৮০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়। এসব নোটেরই চাহিদা বেশি। তাছাড়া আছে ১০০, ৫০০ ও এক হাজার টাকার নতুন নোট।

২ টাকা থেকে ১০০ টাকার নোট যা-ই নিক একই হারে কমিশন দিতে হয়। নোট ছাড়াও ২ বা ৫ টাকার কয়েনও নিচ্ছেন অনেক ক্রেতা। ৫শ’ বা ১ হাজার টাকার ভাংতি হিসেবে কয়েন নিতে দেখা গেছে অনেককে। জানা যায়, ব্যাংকে গিয়ে টাকা না পাওয়ায় বা ঝামেলা এড়াতে লোকজন এসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নতুন টাকা সংগ্রহ করে।

অভিযোগ রয়েছে, ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ নতুন টাকা আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকে নতুন টাকা সরবরাহ করে। সাধারণ মানুষ নতুন টাকা না পেলেও টাকা ব্যবসায়ীরা যথাসময়ে তা পেয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কতিপয় কমকর্তা-কর্মচারী তাদের কাছে নতুন টাকা সরবরাহ করেন।

টাকা ব্যবসায়ী জানান, তারা দৈনিক ৩/৪ হাজার টাকা বিক্রি করেন। স্বাভাবিক সময়ে ৫শ’ টাকাও বিক্রি করতে পারেন না। এ ব্যবসা দিয়ে কোন মতে তাদের সংসার চলে। নতুন টাকার বিভিন্ন ধরনের নোট বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মও দেখা যায়। খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার (ক্যাশ) যোগসাজশে সাধারণ মানুষদের ধোঁকা দিয়ে দৈনিক প্রায় কোটি টাকা তুলে নিচ্ছে দালার চক্র।

কিন্ত ঢাকাসহ এর আশাপাশ এলাকা থেকে সাধারণ গ্রাহক দীর্ঘ লাইন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও টাকা তুলতে পারছেন না। নতুন টাকা তোলা নিয়ে বছরের প্রায় সব সময়ই সাধারণ মানুষের কম-বেশি হয়রানি হলেও ঈদ-উল-ফিতর ও আযাহার সময় এটি বৃদ্ধি পায়। এ সময় দালাল ও প্রতারক চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।

এছাড়া ঢাকার বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট শহরের পাঁচটি করে এবং বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী অঞ্চলের তিনটি করে বিশেষ কাউন্টার থেকে নতুন নোট বদল করা যাবে।

বিশ ও দশ টাকার একটি, পাঁচ টাকার তিনটি, দুই টাকার একটি বান্ডেল ছাড়াও ৫, ২ ও ১ টাকার একশটি কয়েনসহ একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বদল করে নিতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ উপলক্ষে এসব নতুন নোট বাজারে ছেড়েছে।

ঢাকা, ১ অক্টোবর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর