ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-১৫) সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যেসব অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি ছিল, সরকার তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা থাকলেও তা হয়নি। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার আশানুরূপ নিষ্পত্তি হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক খবর হলো, গত চার বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। এর লাগাম টানার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। অথচ এসব সূচক সুশাসন নিশ্চিতের অন্যতম হাতিয়ার। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের মধ্যবর্তী মূল্যায়নে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্যবর্তী মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণের অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক ব্যবসায়ীকে ঋণ দেওয়া উচিত নয়, এর পরও ব্যাংক তাঁদের ঋণ দেয়। খেলাপি ঋণ কমানোর ব্যাপারে তিনি সবার পরামর্শ চান। তবে অর্থমন্ত্রী এও বলেন, ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে গেলে জুতা ক্ষয়ে যায়। ঘাটে ঘাটে ঘুষও দিতে হয়।
এ জন্য ব্যবসায়ীরা ওই ঋণ সঠিক সময়ে ফেরত দেন না। অর্থমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই সরকারি আয় ও ব্যয় কম। তবে এ দেশে অসমতাও কম। অন্যান্য দেশে অসমতা অনেক বেশি। মন্ত্রী জানান, পাবলিক সার্ভিস সংস্কার সরকার এখনো করতে পারেনি। এটি করা হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ে স্বস্তিতে নেই সরকার। আগে ছয় মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে খেলাপি হতো। এখন ব্যাসেল ৩ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ৯০ দিনের মাথায় অনেকে খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। ৯০ দিনের বিধান করার পর খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাফে ২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান গভর্নর।
এদিকে দুই শ প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে আছে প্রায় রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১২ হাজার কোটি টাকা। সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের তিন-চতুর্থাংশ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ২০০ গ্রাহকের খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই সোনালী ব্যাংকের। শীর্ষ ৫০ খেলাপির কাছেই রয়েছে এ ব্যাংকের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। প্রায় একই চিত্র অপর তিন ব্যাংকের ক্ষেত্রেও।
প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণের এক-চতুর্থাংশ রয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে। ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের জন্য দায়ী।
এ জন্য ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে দায়ী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কাছে বিপুল টাকা আটকে পড়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা অনেকাংশেই কমে গেছে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শীর্ষ ২০০ ঋণখেলাপির অধিকাংশই পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান। চার ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপির তালিকায় রয়েছে ৫৮টি গার্মেন্টস। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কম নয়।
সোনালী ব্যাংক: চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে ৫০ ঋণখেলাপির হাতে রয়ে গেছে সোনালী ব্যাংকের প্রায় পাঁচ হাজার ৫২৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বছর সোনালী ব্যাংককে ৩১৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সোনালী ব্যাংক জানুয়ারি-জুন সময়ে মাত্র ৭৩ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে।
সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ৫০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হলমার্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৪৬৫ কোটি, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের ৫২৫ কোটি, আনোয়ার স্পিনিংয়ের ৪৭৪ কোটি, টি অ্যান্ড ব্রাদার নিটওয়্যার কম্পোজিটের ১৯৩ কোটি, এক্সপারটেকের ১৭৫ কোটি, ওয়ালমার্টের ১৭০ কোটি, জিএমজি এয়ারলাইনসের ১৬৬ কোটি, মুন্নু ফেব্রিকসের ১৬৩ কোটি ও রূপসী নিটওয়্যারসের ১৪০ কোটি টাকা আটকে আছে।
অগ্রণী ব্যাংক: শীর্ষ ৫০ খেলাপির কাছে অগ্রণী ব্যাংকের দুই হাজার ৮৫০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আটকে আছে। এ ব্যাংকের ৫০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) কাছে ১৮৮ কোটি, আদমজী জুট মিলের কাছে ১৫৬ কোটি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুডের কাছে ১৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের কাছে ৬৩ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
জনতা ব্যাংক: শীর্ষ ৫০ খেলাপির কাছে আটকে আছে জনতা ব্যাংকের দুই হাজার ৬৩৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চলতি বছরের ছয় মাসে ১২০ কোটি টাকা আদায়ের কথা থাকলেও মাত্র ২১ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে ব্যাংকটি।
ব্যাংকটির ৫০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা ট্রেডিং হাউসের কাছে ২৮০ কোটি, শাহরিজ কম্পোজিট ৩১৪ কোটি, হিন্দুল ওয়ালি ১৯৮ কোটি ও আলফা কম্পোজিট টাওয়ালে ১৫৬ কোটি টাকা আটকে আছে।
রূপালী ব্যাংক: শীর্ষ ৫০ ঋণখেলাপির দখলে রয়েছে রূপালী ব্যাংকের ৭৪৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। জানুয়ারি-জুন সময়ে ৩৮ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যাংকটি ১৪ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
এ ব্যাংকের ৫০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ১৪৮ কোটি ও জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিংয়ের কাছে ১১৫ কোটি টাকা আটকে আছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে জমে ওঠা খেলাপি ঋণের মধ্যে বেশির ভাগ ঋণই বড় বড় খেলাপির কাছে আটকে আছে। বিশেষ করে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে এসব ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে মামলা করেও ঋণ আদায় করতে পারছে না। প্রকৃতপক্ষে শীর্ষ খেলাপিদের কাছে ঋণের পরিমাণ আরো বেশি ছিল। কিন্তু ঋণ নবায়নের বিশেষ ছাড় দেয়ায় বিপুল অঙ্কের ঋণ নবায়ন করা হয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ ছিল এর প্রায় ৭৯ শতাংশই মন্দ বা ক্ষতিকর। অর্থাৎ এ ঋণ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কম। এর বড় অংশ আবার সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর।
সম্প্রতি দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর তৈরি করা প্রতিবেদন ‘ফিনানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৩’তে এ তথ্য তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এতে আরো বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে খেলাপি ঋণের ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষতিকর এবং আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যদিও ২০১২ সাল শেষে তা ছিল ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশই ধারণ করছে পাঁচটি ব্যাংক। আর ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ অন্য ১০ ব্যাংকের। এভাবে খেলাপি ঋণও কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে কয়েকটি সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে; যা পুরো খাতকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা, ১১ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর





