দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে ব্যবসা দিনদিন বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। এ ব্যবসার সাথে জড়িত মিল মালিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
ব্যাংকের বড় অঙ্কের সুদ টানতে গিয়ে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা যেমন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, তেমনি সাধারণ ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরাও দুর্দিন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থা আরো কিছু দিন চলতে থাকলে এ শিল্পের সাথে জড়িত সবাই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। এ মোকাম থেকে আগে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক শ’ট্রাক চাল সরবরাহ হলেও আজ এখান থেকে ৫০ ট্রাকের বেশি চাল যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে রেকর্ডসংখ্যক মিল ব্যাংকের দায়বদ্ধতার কারণে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আবার অনেক মিলে চাল উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় চালকল মালিকেরা জানান, ভারতীয় চাল দেশের বাজারগুলো দখল করে রাখায় দেশীয় চাল বিক্রি কমে গেছে। কেজিপ্রতি দাম ৩ টাকা কমলেও ক্রেতা আসছে না কুষ্টিয়ার খাজানগরের মোকামে। খাজানগর এলাকার একাধিক মিল মালিক জানান, ভারতীয় চালে বাজার সয়লাব হওয়ায় দেশীয় সরু চালের ক্রেতা কমে গেছে। যা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরের ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
খুব দ্রুত ভারতীয় চাল বাংলাদেশে আসা বন্ধ না হলে চালকল মালিকদের বড় ধরনের হুমকির ও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে। এ কারণে এ শিল্পের সাথে জড়িত লাখ লাখ মানুষ আকস্মিকভাবেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। এর প্রভাব দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে মিল মালিকেরা জানান।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতি কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন সাধু জানান, হঠাৎ করে খাজানগর চালের মোকাম ক্রেতা শূন্য হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন ভোর হলেই যেখানে খাজানগর জমজমাট হয়ে উঠতো সেখানে এখন ক্রেতাই নেই। গত বছরে এমন ছিল না। দেশীয় চাল মোকামে প্রচুর মজুদ রয়েছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মিল মালিকেরা। হাজার হাজার শ্রমিকেরা হয়ে পড়ছেন বেকার।
চালকল মালিক সমিতির শীর্ষ এক নেতা জানান, দেশের বাজারে এ মুহূর্তে যে চাহিদা তার চেয়ে দ্বিগুণ চাল ভারত থেকে আনা হচ্ছে। দেশীয় চাল পর্যাপ্ত পরিমাণে বিভিন্ন জেলার গোডাউনগুলোতে মজুদ রয়েছে। তার ওপর ভারত থেকে চাল আসায় বাজারে চালের ছড়াছড়ি। ভারতের চালের দাম দেশীয় চালের তুলনায় কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা কম। এসব কারণে দেশী চালের মজুদ বেড়ে যাচ্ছে।
জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, খাজানগর এলাকায় ছোট বড়দিয়ে মোট অটো রাইস মিল রয়েছে ২৬টি। হাসকিং রয়েছে প্রায় ২৬০টি। চালকল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি নর্থবেঙ্গল রাইস মিলের মালিক আব্দুল মজিদ বাবলু জানান, অর্ধেক মিল মালিক তাদের চাতালে চাল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের গুদামগুলোতে চালের বস্তার পিরামিড হয়ে আছে।
সরেজমিন ঘুরে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর দোস্তাপাড়া, আইলচারা ও বলভপুর এলাকায় কোনো মিলের সামনে ট্রাকের দেখা মেলেনি। বেশিরভাগ মিল বন্ধ পাওয়া গেছে। মিল বন্ধ থাকায় শ্রমিকেরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। আবার অনেকে জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন। ফোর স্টার, প্রগতি, আবদুল্লাহ মিলের মালিকেরা জানান, চালের ক্রেতা না থাকায় তারা চাতালে চাল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন।
মিল মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, খাজানগর এলাকায় এখন সব মিল মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টন চাল মজুদ রয়েছে। কিন্তু এখন আবার নতুন চাউল উৎপাদন শুরু হয়েছে ,আর মজুদ চাল নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। মিল মালিকেরা জানান, ভারতীয় চালের কারণে ব্যবসায়ীরা সুবিধা করতে পারছেন না। যারা দেশী চাল মজুদ করেছিলেন তাদের লোকসানে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে।
স্থানীয় ট্রাক অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি ট্রাক যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। আগে খাজানগর এলাকায় দুটি দালাল অফিসের মাধ্যমে কয়েক শ’ট্রাক প্রতিদিন ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যেত। সরবরাহ কমে যাওয়ায় ট্রাক শ্রমিকেরাও বেকায়দায় পড়েছেন।
এমআইএস।





