বারবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ধ্বংস হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী পোশাকখাত এখন শঙ্কার মুখে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ছাড়া এ সংকট নিরসন আদৌ সম্ভব কিনা তা এখন জনমনে প্রশ্ন?

ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরেছেন।

অবরোধ ও হরতালের কবলে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকা।

১৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির গোলটেবিল মিলনায়তনে এফবিসিসিআই’র সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিনের বাসায় বোমা হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ঢাকার গোপালগঞ্জ জেলা ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা। নেতারা বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যার ফলে ছয়শ’ কোটি টাকার এক্সপোর্ট রেমিটেন্স হারিয়েছে ব্যবসায়ীরা।

একই দিনে সংবাদ সম্মেলনে পর্যটন খাতের ক্ষতির কথা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। তারা বলেছেন, টানা অবরোধ ও হরতালের ফাঁদে পড়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে দেশের পর্যটন খাত। এভাবে চলতে থাকলে এ মৌসুমে শত কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অবরোধ ও হরতালে তাদের ব্যবসায় স্থবিরতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যটকরা তাদের ভ্রমণ বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

শিগগিরই এর সমাধান না হলে পর্যটন খাত এ মৌসুমে কমপক্ষে ১শ’ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আর যদি হোটেলের হিসাব ধরা হয় তাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

এর আগে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বাংলাদেশে ৬ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একইভাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬.৫ এবং ২০১৬-১৭ এ ৭.০ প্রবৃদ্ধি হবে বলেও মনে করছে আর্থিক খাতের বড় এ প্রতিষ্ঠানটি। ১৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

বিশ্বব্যাংকের এ পূর্বাভাস সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। চলতি অর্থবছরে সরকার দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

এর আগের অর্থ বছরে অর্থাৎ ২০১৩-১৪ সালে সরকারের ৭ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় ৬ দশমিক ১ শতাংশ।

একইভাবে বাংলাদেসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতাকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকায় এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।

এবারের প্রতিবেদনে ২০১৪ সালকে বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি 'হতাশাজনক বছর' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ২০১৪ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংক মনে করছে, ২০১৫ সালে তা ৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে ২০১৬ সালে ৩.৩ হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি ভারত ও নেপালের প্রবৃদ্ধি বাড়বে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি কমবে।

গত ১২ জানুয়ারি সোমবার দুপুরে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সংহিসতার কারণে গত ১২ দিনে (১২ জানুয়ারি পর্যন্ত) পোশাক শিল্পে ক্ষতি হয়েছে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা।

সংগঠনটি মনে করে, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অশনিসংকেতের আশঙ্কা রয়েছে।ক্রেতারা এমন পরিস্থিতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এভাবে চলতে থাকলে ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাবে।

চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, চলমান টানা অবরোধ এবং দেশের লাইফ লাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাসে ধীরগতির সৃষ্টি হয়েছে।

এই কারণে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আয়ের পরিমাণও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেছে বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ৬১৯ কোটি টাকা বেশি। এই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অর্থবছরের শুরু থেকে রাজস্ব আদায়ের গতি স্বাভাবিক থাকলেও অর্থবছরের শেষ ছয় মাসের শুরু জানুয়ারি থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ায় রাজস্ব আয়ে ঘাটতির আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।

দেশের পরিবহন খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবহণ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ খাতকে বাঁচাতে সকলের প্রতি আহবান জানান। 

দেশের এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানই ধ্বংসের দিকে নিমজ্জিত হচ্ছে।

দেশের মানুষ মনে করছে, এসব প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সকল বিরোধীদলের যেমন ভূমিকা রয়েছে তেমনি, সরকারকেও জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ববান হতে হবে। সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে সরকারকেই। সকল মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি সরকার এবং বিরোধী দলকেই নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণ মানুষ মনে করছেন এমন সংকট নিরসনে রাজনীতিক নেতাদের পাল্টা-পাল্টি বক্তব্য খুবই দুঃখজনক।

এমকে