দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সরকারি ব্যাংকের হাজার হাজার শাখা। মূলধন জোগানদাতা সরকারি কোষাগার। কর্মীদের রয়েছে সরকারি স্কেলের উচ্চ বেতন, কাজ না করেও পদোন্নতি আর চাকরির নিশ্চয়তা।
বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো সত্ত্বেও প্রধানত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলো। আয়েশি সেবা প্রদান, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আখের গোছাতেও ব্যস্ত কর্মকর্তারা।
গ্রাহকের সেবায় তেমন মনোযোগী নন। ফলে ক্রমে সরকারি ব্যাংকবিমুখ হচ্ছেন গ্রাহকরা। এতে ব্যাংকিং খাত পড়ছে সংকটের মধ্যে। সময়োপযোগী ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ড ও পিছিয়ে সরকারি ব্যাংকিং খাত। এছাড়া আইটি সেক্টরেও রয়েছে দুর্বলতা।
স্বাধীনতার পর পরই সরকারি ব্যাংকগুলোর যাত্রা শুরু। বর্তমানে তফসিলিভুক্ত ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ২ বিশেষায়িত ব্যাংক রয়েছে। ১৯৮২ সালে প্রথম বেসরকারি ব্যাংক চালু হয়। এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ব্যাংক রয়েছে ৪৯টি। বর্তমানে সব ব্যাংকের মোট শাখা ৯ হাজার ৬৫৪টি। এর মধ্যে সরকারি ৮ ব্যাংকের শাখা ৫ হাজার ১১৭টি, যা মোট শাখার ৫৩ শতাংশ।
প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর অর্ধেকের বেশি হলেও অর্থনীনিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না সরকারি ব্যাংকগুলো। ঋণের নামে এক সময় এই ব্যাংকগুলোর টাকা লুটপাট করা হয়েছে। লুটপাটের পরিমাণ কমার সঙ্গে সঙ্গে বিতরণও কমে গেছে।
বর্তমানে মোট ঋণের মাত্র ১৭ শতাংশ দিয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। তবে সরকারি বড় প্রকল্পের টাকা জমা থাকায় এই ব্যাংকগুলোয় জমাকৃত আমানত বেশি। মোট আমানতের ৩৩ শতাংশ জমা রয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোয়।
আমানত সংগ্রহ করে ঋণ বিতরণ করা ব্যাংকগুলোর প্রধান কাজ। সেই কাজ প্রায়ই বন্ধই করে দিয়েছে এই খাতের ব্যাংকগুলো। যেখানে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর ৮০ থেকে ৯০ ভাগ আমানত ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো মাত্র ৫০ থেকে ৬০ ভাগ বিতরণ করতে পারছে।
সোনালী ব্যাংক ৫২ শতাংশ এবং রূপালী ব্যাংক ৫৫ শতাংশ আমানত ঋণ হিসেবে বিতরণ করছে। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক আমানতের ৮৭ শতাংশই ঋণ দিতে পেরেছে। আর্থিক খাতের সব মন্দ সূচকের শীর্ষে রয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো।
সরকারি ব্যাংকের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ এর কর্মকর্তারা। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও তারা সরকারি অফিসারদের মতো আচরণ করেন। বেসরকারি ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সম্মান ও সেবা দান করে। সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা গ্রাহকদের সেবা দিতে চান না। সম্প্রতি তাদের বেতন দ্বিগুণ হয়েছে।
কিন্তু কাজের গতি তেমন বাড়েনি। উল্টো একগুঁয়েমি ও নিজেদের স্বার্থে নানা ধরনের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে ব্যাংক কর্মকর্তারা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে অনেক তৎপর হওয়ায় আগের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে।
এসব মামলাকে হয়রানিমূলক মনে করে বর্তমান কর্মকর্তারা মূল কাজ ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ঋণবিষয়ক কোনো কাজে তারা দায়িত্ব নিচ্ছেন না। কাজ না করলেও যেহেতু তাদের বেতন পদোন্নতি স্বাভাবিকভাবেই হয় তাই কেউ কাজ করছেন না।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান বলেন, সরকারি ব্যাংকে প্রচুর অলস টাকা রয়েছে। অথচ গ্রামের মানুষ চাহিদার তুলনায় ঋণ নিতে পারছেন না। তাদের চাহিদার মাত্র ৪০ ভাগ ঋণ পাচ্ছেন। সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা ঋণ প্রদান সংক্রান্ত কাজ একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন। কারণ কাজ না করলেও তাদের বেতন হচ্ছে।
ইউনুসুর রহমান বলেন, সরকারি ব্যাংকের আমানত ও ঋণ কার্যক্রম ক্রমে সীমিত হয়ে পড়ছে। ঋণ বিতরণ যেভাবে কমে যাচ্ছে তাতে ব্যাংকগুলো টিকে থাকবে কিনা সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সরকারি ব্যাংকে প্রশাসনিক অনেক সমস্যা রয়েছে। অনেকে কর্মকর্তাই রাজনীতি ও অন্য কোনো দাপটে স্বাভাবিক নিয়মে চলছেন না। সবাই কাজ ছেড়ে শহরে এসে আয়েশি জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। শহরের একটি শাখায় অনুমোদিত জনবল ২০ জন থাকার কথা হলেও রয়েছে ৫০ জন।
অথচ গ্রামের একটি শাখায় ১০ জনের পরিবর্তে রয়েছে ৩ জন। স্বাভাবিক নিয়মে শাখা ব্যবস্থাপক পরিবর্তন হয়ে থাকেন। আগের শাখা ব্যবস্থাপকের কাজের দায়িত্ব বুঝে নেন নতুন শাখা ব্যবস্থাপকরা। কিন্তু আগের বিতরণকৃত ঋণ আদায়ে তেমন পদক্ষেপ নেন না।
রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন বলেন, একগুঁয়েমি ও নানা ধরনের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যাংকের কর্মকর্তারা ভুল করে চলেছেন। নিজেদের সৃষ্ট সমস্যাগুলো তাদেরই সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের ভেতরে আরেক ধরনের অফিসের সৃষ্টি হয়েছে। কল্যাণমূলক ও নিজেদের অধিকার রক্ষায় ট্রেড ইউনিয়ন থাকা দরকার। কিন্তু ইউনিয়ন যদি কর্মী নিয়োগ ও বদলি, ঋণ বিতরণে হস্তক্ষেপ করে তাহলে এদের বিষয়ে ভাবতে হবে।
সরকারি ব্যাংকগুলো ৪০ বছর আগে যে ধারণায় যাত্রা শুরু করেছিল এখনো অনেকটাই সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। অর্থনীতির গতি ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো।
৩০ বছরের আগের সঞ্চয়ী ও ঋণ প্রকল্পগুলো চালু রয়েছে। নতুন করে কিছু আনা হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো যুগোপযোগী সেবা চালু করেছে। কিন্তু সরকারি ব্যাংক নিজেরাই এখনো অনলাইনের আওতায় আসতে পারেনি। এমনকি জনপ্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমে সরকারি ব্যাংকগুলোর কোনো কার্যক্রম নেই।
আর্থিক খাতে উন্নয়নে অবদান না থাকলেও আর্থিক খাতের মন্দের শীর্ষে সরকারি ব্যাংকগুলো। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি, লোকসান ইত্যাদি আর্থিক খাতের অভিশাপ। এই অভিশাপগুলোর সৃষ্টিই সরকারি ব্যাংকগুলোয়। বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে।
অথচ সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ এর থেকে ৮ গুণ বেশি। সোনালী ব্যাংকে খেলাপি ২৩ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকে ২৫, জনতা ব্যাংকে ১৫, রূপালী ব্যাংকে ১৭, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৫৮ এবং বেসিক ব্যাংকের ৫৩ ভাগ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। অধিকাংশ ব্যাংকের মূলধন খেলাপি ঋণের কারণে আটকে গেছে।
প্রায় প্রতিবছর জনগণের কাছ থেকে আদায় করা টাকা থেকে সরকার মূলধন জোগান দিচ্ছে। চলতি বছর বেসিক ও রূপালী ব্যাংক মূলধন চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের ৬৫ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে ৩৫ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা টাকা বা ৫৩ শতাংশই সরকারি ব্যাংকগুলোর।
মুনাফা অর্জনে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে সরকারি বাংকগুলো। সোনালী ব্যাংকের ১ হাজার ২০০টিরও বেশি শাখা থাকলেও গত বছরের তুলনায় পরিচালন অর্ধেক কমে ৪০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির মুনাফা হয় ৮৬৩ কোটি টাকা। অথচ ইসলামী ব্যাংক মাত্র ৩১৮টি শাখা নিয়ে ২ হাজার ৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। গত বছরের তুলনায় সরকারি সব ব্যাংকেরই মুনাফা কমেছে।
জনতা ব্যাংক ১ হাজার ১৬১ কোটি টাকা থেকে কমে ১ হাজার ৪ কোটি, অগ্রণী ১ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ৫৯৮ কোটি, বিডিবিএল ১২১ কোটি টাকা থেকে কমে ৬২ কোটি পরিচালন মুনাফা করেছে। রূপালী ব্যাংক ৮৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে। প্রতিনিয়তই বাড়ছে সরকারি ব্যাংকগুলোর লোকসানি শাখা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ব্যাংকের মূল কাজ ব্যবসা করা। নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে হবে। সঠিক নিয়ম পরিচালন করে ঋণ বিতরণ করলে দুদককে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।(সূত্র-আমাদের সময়)
এমবি





