পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট চক্র। রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না-সরকারের এমন ঘোষণা সত্বেও নিত্য পণ্যের বাজারে দাম বৃদ্ধির ঘোড়া দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

খোলাবাজারে দফায় দফায় বাড়ছে জিনিসের দাম। ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজান এলেই কোনো কারণ ছাড়া বেড়ে যায় দাম। দাম বেড়ে যাওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে মোটা ও চিকন চাল, চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা, আলু, টমেটো, শসা, বেগুন, লেবু, পিয়াজ আদা, কাঁচামরিচ, ডাল, মুরগি ও গরুর মাংস। এর মধ্যে বেগুন, চিনি, চাল ও কাঁচামরিচের দাম বেড়েছে বেশি।
রাজধানীর বাজারে শনিবার প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায়, দুইদিন আগেও যা ছিল ৪০ টাকা। বেগুনের পাশাপাশি দাম বেড়েছে কাঁচামরিচেরও।

একদিনেই প্রতি কেজি কাঁচামরিচের দাম ৫০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকায়। এছাড়া রমজানে অতি প্রয়োজনীয় লেবু, শসা, ধনেপাতা, টমেটো, গাজরসহ প্রায় সব ধরনের কাঁচা পণ্যের দাম বেড়েছে।
এদিকে বৃষ্টিতে সরবরাহ সংকট আর রমজানের আগে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ার অজুহাত দেখাচ্ছেন বিক্রেতারা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি নিত্যপণ্য রফতানি নিষিদ্ধ করার দুইদিন পর শনিবারের কাঁচাবাজারের চিত্র এটি।

রমজানে বেড়ে যায় নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের চাহিদা। ফলে চাহিদা মেটাতে বেগুন, শসা, লেবু, কাঁচামরিচ ও ধনেপাতার রফতানি নিষিদ্ধ করা হয়। ঘোষণার পর থেকে রমজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। সচিবালয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিত্যপণ্যের মজুদ সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে এক বৈঠকে এ ঘোষণার কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

সরেজমিন রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি শসা ২৫-৩০ থেকে বেড়ে ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া টমেটো ৩০-৪০ থেকে বেড়ে ৫০-৬০ ও গাজর ৩০-৩৫ থেকে ৪৫-৫০ বেড়ে টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও বাজারে লেবুর ছড়াছড়ি ছিল। শনিবার থেকে পণ্যটির সংকট শুরু হয়েছে। প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ২০-৩০ টাকায়। ধনেপাতার কেজি ২০০-২৫০ টাকা। এছাড়া পটোল, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ঢেঁড়সসহ অন্যান্য সবজির দামও বেড়েছে।

একদিনে এত দাম বাড়ার কারণ জানেন না বিক্রেতারাও। তবে ক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, রমজানের কারণেই বেশি মুনাফার আশায় প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শান্তিনগর বাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতা আজিজ বলেন, রোজা সামনে রেখে একদিনেই বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি। এতে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই পাইকারি বাজারে এসব পণ্যের দাম চড়া।

এদিকে জানা গেছে, আমদানিকৃত পেয়াজের দাম গত সপ্তাহে প্রতি কেজিতে গড়ে ৫ টাকা ও দেশি পিয়াজের দাম ১০ টাকা বেড়েছে। দেশি পিয়াজ প্রতি কেজি ৩৫-৩৬ এবং ভারতীয় পিয়াজ ৩২-৩৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছোলা বিক্রি হয়েছে ৬৫ থেকে ৬৬ টাকায়। ভোজ্যতেল বোতলে বিক্রি হয়েছে ২৬৮ টাকায়। এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির জন্য দুষছেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের।

তারা বলছেন, একদিন পর পবিত্র রমজান মাস শুরু হচ্ছে। দাম বাড়ানোর জন্য শুক্রবার থেকে ছোলা, ভোজ্যতেল, চিনি ও পিয়াজের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন পাইকাররা।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে দেশি পিয়াজের। এ ছাড়া সরকারের বাজার মনিটরিং সেলের পরিদর্শন বেড়ে গেলে দাম স্থিতিশীল থাকবে।

বাজার ঘুরে আরও দেখা গেছে, দেশি-বিদেশি সব রসুন ৯০-১০০, আমদানি করা আদা কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৯০-৯৫, দেশি আদা ১০০-১১০ ও শুকনা মরিচ ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শবেবরাত উপলক্ষে দুই সপ্তাহ আগে ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়লেও আর কমেনি।

শনিবার প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৬৫-১৭০ টাকায়। মুরগির দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগামীকাল থেকে রমজান শুরু হলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।

খামারিরা মুরগির সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের। বছরজুড়ে ২৭০ টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। মহিষের মাংস বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায়।

এ ছাড়া বর্ষার কারণে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। নতুন চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ হলেও আগের চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। শনিবার প্রতি কেজি মিনিকেট ৪৬-৪৮, বি আর-২৮ ৩০-৪২, নতুন ৩৬-৩৮, নাজিরশাইল ৪৮-৫০, লতা ৪৮-৫০, স্বর্ণা ৩৮-৪০, পারিজাত (মোটা) ৩৬-৩৮ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে। তবে আটা ও ময়দার দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
এ ছাড়া খোলাবাজারে ৫০-৫২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে চিনি। পাইকারিতে চিনির দাম কমলেও এর প্রভাব নেই খুচরা বাজারে। টিসিবি খোলাবাজারে প্রতি কেজি চিনি ৪৪ টাকায় বিক্রি করলেও দোকানিরা আগের বাড়তি দামেই বিক্রি করছেন।

এ ছাড়া টমেটোর দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই দিন আগের ৪০ টাকার বেগুন শুক্রবার থেকে কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৬ টাকা দরের আলু ২০ টাকায়, ৩৫ টাকার শসা ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এ ছাড়া মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইলিশ, রুই, শিং, কৈ ও পাঁচমিশালি মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। এসব মাছের দাম কেজিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।

সিদ্ধেশ্বরী থেকে বাজার করতে আসা সিরাজুল ইসলাম টাইমনিউজ বিডিকে বলেন, সরকারের এতসব পদক্ষেপ নিয়ে কী লাভ হলো? কাঁচাবাজারে সব কিছুরই তো দাম দ্বিগুণ হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি আর রোজার জন্য সবাই বাজারে এসেছে, কিন্ত কিনতেই মাথায় হাত দিতে হচ্ছে। একদিনেই দাম দ্বিগুণ হয় কী করে?

ঢাকা, ২৮ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর