চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর দেয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রস্তাবের বাস্তবায়ন হলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমার পরিবর্তে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করলেন খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী।

আজ (সোমবার) পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, এই চুক্তির আগে আমরা ভালো করে সবকিছু খতিয়ে দেখব। এমনকী সাংবাদিকসহ সবার মতামত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।

তবে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তিনদিনের ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল (রোববার) দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান মাহমুদ আলী।

মন্ত্রী বলেন, যদি এমন পরিস্থিতি দেখা যায় যে, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়বে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন নতুন প্রস্তাব দেয়া হলে তা বিবেচনা করা হবে বলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৩-১৪ অর্থ-বছরের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমান প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ওই হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে চীন বাংলাদেশে প্রতি বছর রপ্তানি করছে ৭.৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। অপরদিকে, বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি করছে বছরে মাত্র ২৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।

তবে, চীনের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশের সাথে বাংলাদেশের সব সময়ই বাণিজ্য ঘাটতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ চীন বর্তমানে বহির্বিশ্বে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করছে।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী বছর (২০১৫) বাংলাদেশ-চীন তাদের কুটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করতে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, রোববার দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ১৯-সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। অপরদিকে, ১৩-সদস্যের চীনা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ঢাকা সফররত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।

ওই বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, চীন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমরা প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখব।

বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক ধান গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনে চীনের আগ্রহের কথা দেশটির সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ গুরুত্বের সাথে বৈঠকে উত্থাপন করেছেন বলেও জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ আলী।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানি করতে চীন আগ্রহী বলেও বৈঠকের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রী।

পাশাপাশি, বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি, জ্বালানী ও ভৌত-অবকাঠামো-এই পাঁচ খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে চীন প্রস্তুত বলেও জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার যেই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ শুরু করেছে তাতে চীন সন্তোষ প্রকাশ করেছে।

তবে, বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মানে চীনের আগ্রহের যেই বিষয়টি এর আগে বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে তা নিয়ে বৈঠকে কোন আলোচনাই হয়নি বলেও জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রী।

তিনি বলেন, চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপনের ব্যাপারে বৈঠকে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আগ্রহ ব্যক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোন তৃতীয় দেশের আগ্রহ-অনাগ্রহের বিষয় নেই বলেও জানান মন্ত্রী।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়াতে ভিসা সহজীকরণ করাসহ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।   

এছাড়াও তিন ঘণ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের পরিধি আরও বাড়ানো, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সমুদ্র সহযোগিতা, জ্বালানি সহযোগিতা, কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রী।

কেবি