প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে অনেক দেশ করপোরেট কর কমিয়ে রাখছে। কর এড়ানো কিংবা ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকায় বিশ্বের বড় বড় অনেক কোম্পানি সেসব দেশে পাড়ি জমাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, দ্রুত বর্ধনশীল উন্নয়নশীল দেশগুলোর করপোরেশনগুলোর মধ্যেও এ প্রবণতা বাড়ছে, যার সবচেয়ে বেশী ভুক্তভোগী হচ্ছে তাদের জনগণ। রাজস্ব ঘাটতি বাড়ায় তাদের অর্থনীতি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খবর এএফপি, ফিনফ্যাক্টস ও ইন্টার প্রেস সার্ভিস।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘স্পিলওভারস ইন ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্সেশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইএমএফ বৈশ্বিক করপোরেট কর ব্যবস্থা ও এর ফাঁকফোকরের প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করে। প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াতে ২০০৮ সালের পর উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ করপোরেট কর কমিয়ে আনে। এছাড়া কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের মতো অনেক দেশে আগে থেকেই করপোরেট কর অস্বাভাবিক হারে কম।
সাম্প্রতিক মন্দার বছরগুলোয় ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেরই বাজেট ঘাটতি ও সরকারের ঋণ বিপদসীমা ছাড়ায়। রাজস্ব বাড়াতে অনেকে কর বাড়ায়। একই সময়ে কর সুবিধা পেতে তাদের কোম্পানিগুলো অন্যান্য দেশে করপোরেট করভিত্তি সরিয়ে নেয়। এভাবে নতুন দেশের আইনে কোম্পানি নিবন্ধিত করে বিশ্বের অনেক বড় বড় করপোরেশন তাদের করপোরেট কর পাঁচ ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনার বহু নজির সৃষ্টি করেছে। কেম্যান আইল্যান্ডের মতো একটি দেশের অনেক কোম্পানি উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু বড় প্রকল্পের কাজ করছে, আদতে যা করার সক্ষমতা থাকার কথা নয় তাদের। এতে রাজস্ব বঞ্চিত হয় করপোরেশনগুলোর আদি দেশের সরকার। একইভাবে বিনিয়োগের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবেও উন্নয়নশীল দেশগুলো রাজস্ব বঞ্চিত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রাজিল থেকে বিশ্বে যে পরিমাণ এফডিআই যায় এর প্রায় অর্ধেকেরই প্রাথমিক গন্তব্য অস্ট্রিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড বা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের মতো করস্বর্গগুলো। সেখান থেকে এসব কোম্পানি নাইজেরিয়ার মতো মূল গন্তব্যে ব্যবসা করতে যায়। স্বাগতিক দেশে নিবন্ধিত কোম্পানি হিসেবে বেশি সুযোগ পেলে তারা তা-ই করে, না হলে করস্বর্গভিত্তিক কোম্পানি হিসেবেই ব্যবসা চালিয়ে যায়। বছর শেষে অনেক কম কর দিয়ে কোম্পানি তার মালিকদের কাছে অধিক মুনাফা পাঠিয়ে দেয়। কেবল কম করের কারণে রুশদের বিদেশী বিনিয়োগের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই যায় সাইপ্রাস বা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোয়।
সেখান থেকে সারা বিশ্বে ব্যবসা ছড়িয়ে দেয় তারা। আইনসিদ্ধ উপায়ে কর এড়ানোর দৌড়ে পিছিয়ে নেই পশ্চিমের করপোরেশনগুলোও। মেধাস্বত্ব, পেটেন্টসহ অনেক অদৃশ্য সম্পদ কর আয়ারল্যান্ডের মতো করস্বর্গগুলোয় স্থানান্তর করে সহজে বড় অঙ্কের কর এড়াতে পারছে অ্যাপল, গুগলের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরা।
আইএমএফ বলছে, উদীয়মান বিশ্বের করপোরেশনগুলোর মধ্যে করস্বর্গে (যেসব দেশে করহার কম) যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সংস্থাটি আরো বলে, যত বেশি দেশ বিনিয়োগ আকর্ষণে অন্যায্য ও অস্বাভাবিক কর সুবিধা দেবে, বিশ্ব সম্প্রদায় তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ প্রবণতার বেশ কয়েকটি কুফল রয়েছে। তবে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে, নিজ দেশের সরকারের রাজস্ব কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়ে স্বাগতিক দেশেরও উপযুক্ত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়া।
২০১১ সালের পর থেকে ইউরোপ-আমেরিকার সরকারগুলো আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগে কর ফাঁকি রোধে কঠোর অবস্থানে যায়। অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোর পলিসি ফোরাম অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) এজন্য একটি বৈশ্বিক কর ও হিসাব কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যার আওতায় প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো নিজেদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করবে। প্রায় অর্ধশত দেশ এতে সম্মত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, বৈশ্বিক কর কাঠামোয় একটি ভারসাম্য আনতে বিশ্ববাণিজ্যের মতো কর ব্যবস্থার বিষয়েও একটি বৈশ্বিক ঐকমত্য ও এর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সেখানে কোনো দেশ চাইলেই করপোরেট কর অস্বাভাবিক রকম কমিয়ে অন্য দেশের কোম্পানি ভাগিয়ে আনতে পারবে না।
ঢাকা, ৩০ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর





