ট্যানারি স্থানান্তরে রোববারের মধ্যে ট্যানারি মালিক বরাবর উকিল নোটিস পাঠানোর নির্দেশনা দেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। এর পরের দিনও মন্ত্রীর এ নির্দেশ মানেনি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।

এমনকি চলতি সপ্তাহের মধ্যেও এ নোটিস পাঠানোর কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিসিকের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

বহুল আলোচিত চামড়া শিল্পনগরীপ্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান বিসিক। সোমবার মালিকদের বরাবর একটি সাধারণ চিঠি পাঠায় এ সংস্থাটি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হাজারিবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। আরো অনেক কাজ এখনও বাকি।

ফলে আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে ট্যানারি স্থানান্তর পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব না। মূলত কাজের গতি বাড়ানো জন্য মন্ত্রী মালিকদের আল্টিমেটাম দিয়েছেন।

এ সময়রে মধ্যে কোনোভাবেই সাভারে ট্যানারি কারখানা স্থানান্তর করা সম্ভব না বলে রাইজিংবিডিকে জানান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদও।

তিনি বলেন, ‘সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণকাজ চলছে, যা শেষ হতে এ মাস লেগে যাবে। ফলে সেখানে স্থানান্তর হওয়ার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।

সোমবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চামড়াশিল্প নগরীতে ১৫৫টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৪র্থ তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে একটি, ২য় তলার পাঁচটি ও প্রথম তলার ৩৪টি।

পাইলিং শেষ করে গ্রেটভিম ও কলাম ঢালাই হয়েছে ২৮টির। আরো ১৪টির পাইলিং শেষ হয়েছে, চলমান রয়েছে ৭টি।

পাইল কাস্টিং শেষে পাইল ড্রাইভ করেছে ৭টি; পাইল কাস্টিং করেছে ৩টি; বেস ঢালাই শেষ করে গ্রেটভিম ও কলাম ঢালাই করেছে ২৪টি, বেস ঢালাইয়ের জন্য মাটি খনন ও নির্মাণ উপাদান এনেছে ৬টি, বাউন্ডারি ওয়াল ও গার্ড শেড করেছে ৫টি, শুধু বাউন্ডারি ওয়াল করেছে একটি ট্যানারি। এছাড়া মামলাজনিত কারণে বরাদ্দপত্র জারি হয়নি একটি ট্যানারির।

এমন পরিস্থিতিতে বিসিকের প্রকল্প পরিচালকরা জানান, মালিকদের শিল্প স্থানান্তর করার কাজের গতি আনার জন্য সোমবার একটি সাধারণ চিঠি পাঠানো হয়েছে। আর চলতি সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস অথবা আগামী সপ্তাহে মন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী ট্যানারি মালিক বরাবর উকিল নোটিস পাঠানো হতে পারে।

চামড়াশিল্প নগরী প্রকল্পের ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আবু বাকের সিদ্দিক বলেন, ‘সিইটিপির দুটি মডিউল চলতি মাসের মধ্যে কাজ শেষে হবে। এই মুহূর্তে ২০টি কারখানা সাভারে শিল্প নগরীতে উৎপাদন শুরু করতে পারবে। বাকি কারখানাগুলো চালু হতে অন্তত তিন মাস সময় লাগবে।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবু তাহের বলেন, `যারা ক্ষতিপুরণের টাকা নিয়ে আর কাজ করছে না, তাদের জন্য এই নির্দেশনা। তবে ট্যানারি স্থানান্তরে অর্থসংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, পুরো ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরে খরচ হবে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। সরকার দিচ্ছে ২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল ৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ করতে হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকাররা আমাদের ঋণ দিতে চায় না।

তিনি বলেন, মন্ত্রী মহোদয় বারবার আমাদের আলটিমেটাম দিচ্ছেন ঠিক আছে, কিন্তু তিনি তো ব্যাংকগুলোকেও বলতে পারেন, আমাদের যেন তারা ঋণ দেয়।’

উল্লেখ্য, রোববার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হাজারিবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর না করলে চামড়া কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।

এ লক্ষ্যে এদিনই (রোববার) বিসিককে ট্যানারি মালিক বরাবর উকিল নোটিস পাঠানোর নির্দেশনা দেন তিনি। ৭২ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো ট্যানারি মালিক হাজারিবাগ থেকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্থানান্তরে ব্যর্থ হলে, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে তার নামে বরাদ্দ প্লটও বাতিল করে দেওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

২০০৩ সালে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা। এরপর রাজধানীর অদূরে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

২০০৫ সালের মধ্যে স্থানীয় জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সংযোগের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়।

শুধু বাকি থাকে সিইটিপি স্থাপনের কাজ। ১৭ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন সিইটিপি নির্মাণে অনেক বেগ পেতে হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর চার পর্যায়ে ৬১৪ শতাংশ বাড়িয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধার্য করা হয় ১ হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আগের প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন কোনো কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। নানা কারণে ওই সরকারের শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া কাজটি করতে পারেননি।

এরপর ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান আমির হোসেন আমু।

তার কর্মপরিকল্পনায় চামড়া শিল্পনগরী অগ্রাধিকার পেলেও নির্ধারিত সময়ে সিইটিপির কাজ এখনো শেষ করতে পারেননি।

এমকে