২০১৩-১৪ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও ব্যর্থ হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে সদ্য বিদায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষ করেছে এনবিআর। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ এবং বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি হতে হলো প্রতিষ্ঠানটিকে।
সদ্য সমাপ্ত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আদায় হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার ৫১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে মোট ঘাটতির পরিমাণ চার হাজার ৪৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
তবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের শুরুতে বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে রাজস্ব ঘাটতি ১৫ হাজার ৫৭৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, অর্থবছরের সাত মাস শেষে রাজস্ব আহরণে ঘাটতির যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে লক্ষ্যমাত্রা কমানোর জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করে এনবিআর। পরবর্তী সময় এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ১১ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এর আগের অর্থবছরেও (২০১২-১৩) এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতিতে পড়তে হয়েছিল। ওই অর্থবছরে এক লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছিল এক লাখ নয় হাজার ৫১ কোটি টাকা। ঘাটতি ছিল তিন হাজার ২০৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে দুই বছরে ঘাটতির পরিমাণ সাত হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা।
এদিকে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আয়করে ৫৭ হাজার ৫০০ কোটি, মূসকে ৫৫ হাজার ৫৮০ কোটি এবং শুল্কে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এনবিআর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে একমাত্র শুল্ক বিভাগ ছাড়া অন্য দুই খাত আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের (মূসক বা ভ্যাট) ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও ২০১১-১২ অর্থবছরে এনবিআর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ওই বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছিল ৯৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদায়ী অর্থবছরে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভ্যাট খাতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা কি না ছিল রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত। এ ছাড়া আয়কর খাতে বছরের মাঝামাঝি বেশ কিছু খাতে পরিবর্তন আসায় আয়কর কম আদায় হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, পোশাক রফতানি খাতে উৎসে কর দশমিক ৮ থেকে কমিয়ে দশমিক ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়েছে। এতে এনবিআর প্রায় ২০০ কোটি টাকা কম রাজস্ব পেয়েছে। নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় আমদানি বেড়েছে। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে শুল্ক খাতে অধিক রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থবছরের শুরু থেকে এ ধারা অব্যাহত থাকলে আয়কর ও ভ্যাট খাতে লক্ষ্যমাত্রা আদায় সম্ভব হতো বলে তারা জানান।
এ ছাড়া গত এপ্রিল থেকে তৈরি পোশাক রফতানিতে উৎসে কর শূন্য দশমিক ৮ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্য রফতানিতে শূন্য দশমিক ৮ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ করায় এনবিআর ওই খাত থেকে রাজস্ব কম পেয়েছে বলে দাবি করেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ না হওয়ার কারণে বেসরকারি ব্যাংকিং খাত থেকে তুলনামূলক কম রাজস্ব আদায় হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা জানান, প্রতিবারই সাময়িক হিসাবে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে। তবে চূড়ান্ত হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ কমে আসে। এবারো ঘাটতির পরিমাণ দুই হাজার কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমানসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
এনবিআরের চূড়ান্ত রাজস্ব আদায়ের বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব আহরণের প্রধান তিন বিভাগের মধ্যে শুল্ক বিভাগ ছাড়া অন্য দুই খাত আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাটের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে এনবিআর।
২০১৩-১৪ অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায় আমদানি শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৩ হাজার ৪৩৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে ১৩ হাজার ৫৪০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সে হিসেবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০৫ কোটি ৩৬ লাখ বেশি আদায় হয়েছে।
মূল্য সংযোজন কর (আমদানি পর্যায়ে) আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ৮০৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বছর শেষে আদায়ের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩১৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সে হিসেবে ৫০৯ বোটি ৪৩ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জিত হয়েছে।
সম্পূরক শুল্ক (আমদানি পর্যায়ে) আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় চার হাজার ৫৮৪ কোটি সাত লাখ টাকা। আদায় হয়েছে চার হাজার ৩৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী এ খাতে ঘাটতির পরিমাণ ২৩৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
রফতানি শুল্ক খাতে ৪১ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এনবিআর। বছর শেষে ২৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আদায় হয়। সে হিসেবে এ খাতে ১৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা রাজস্ব ঘাটতি পড়ে।
আবগারি শুল্ক খাতে ৬৯৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৮২২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা আদায় করে রাজস্ব বোর্ড। সে হিসেবে ১২৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আদায় হয়েছে।
মূল্য সংযোজন কর (স্থানীয় পর্যায়ে) খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২৯ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অর্থবছর শেষে আদায় হয় ২৯ হাজার ২৫২ কোটি ১১ লাখ টাকা। সে হিসেবে ৬৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা কম আদায় হয়েছে।
সম্পূরক শুল্ক (স্থানীয় পর্যায়ে) খাতে ১৬ হাজার ২০৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৩ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা আদায় করে। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ দুই হাজার ৫৬১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
টার্নওভার ট্যাক্স খাতে সাত কোটি ২৩ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। বছর শেষে এ খাতে আদায় করে চার কোটি ৭২ লাখ টাকা। এ খাতে দুই কোটি ৫১ লাখ টাকা ঘাটতি রেখেই বছর শেষ করে এনবিআর।
আয়কর খাতে ৪৪ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে রাজস্ব বোর্ড। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় করে ৪২ কোটি ৯১৫ কোটি ৫০ টাকা। অর্থাৎ এক হাজার ৪৪৪ কোটি ৫০ টাকা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আদায় হয়।
এ ছাড়া অন্যান্য খাতে ৯২০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬৪০ কোটি ৩১ লাখ টাকা আদায় করে এনবিআর। সে হিসেবে অন্যান্য খাতে ২৭৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা কম আদায় হয়েছে।
ঢাকা, ১৭ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এমআর





