ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আসন্ন। ঈদের আগে মসলার দাম বাড়বে, ভোক্তার ভোগান্তি বাড়বে এটিই যেন দেশের ব্যবসার সংস্কৃতি। এবারও বেড়েছে মসলার দাম। কোনো কারণ ছাড়া মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে কেজিতে মসলার দাম বেড়েছে দুশ’ টাকার বেশি। পাইকারিতেও বেড়ে গেছে মসলার দর। অথচ গত কয়েক মাস ধরে দেশে মসলার দাম ছিল নিম্নমুখী।

রাজধানীর কয়েকজন পাইকার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে হঠাৎ এই মূল্য বৃদ্ধির কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, মসলার দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গত সপ্তাহের শেষদিনের (বৃহস্পতিবার) সঙ্গে আজকের বাজারের পার্থক্য অনেক।

এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ‘বাঙালি ঈদের আবেগ’ এর ফায়দা নেয়ার অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। আর ঈদের বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে সরবরাহ কমিয়ে কিছু আমদানিকারক মসলার দাম বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ পাইকারি মসলা ব্যবসায়ীদের। আবার কেউ কেউ বলছেন, গত কয়েক মাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পাইকাররা বেশি দামে মসলা বিক্রি করছেন। এমনকি গত কয়েক দিনে চোরাই পথে মসলা আমদানি বেড়েছে বলেও জানা গেছে।

মসলার অন্যতম পাইকারি আড়ত চকবাজারে গিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে এলাচ, রসুন ও শুকনা মরিচের। এ ছাড়া গত তিন-চার দিনেই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে জিরা, হলুদ, দারচিনি, লবঙ্গ ও বাদামের দাম। আর গত সপ্তাহ থেকে বেড়েছে জাফরান ও কালিজিরার দাম।

এক গ্রাম জাফরান মসলা এখন ২৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে যা ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর প্রতিকেজি দেশি কালিজিরা ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে ১৯০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে কালিজিরা।

 দেখা গেছে, গুয়াতেমালা থেকে আমদানি (এলএমজি) এলাচের দাম পাঁচ দিনের ব্যবধানে কেজিতে ১২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯৪৫-৯৬০ টাকায়। প্রতি কেজি জিবিসি এলাচ ৯৪০ ও জেপিবি এলাচ ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত সপ্তাহে প্রতি কেজি জিবিসি ৮৬০ ও জেপিবি এলাচ ১ হাজার ৬০ থেকে ১ হাজার ৭০ টাকায় লেনদেন হয়।

গত সপ্তাহে প্রতি কেজি ভারতীয় হলুদ ১০৫ টাকা ও দেশি হলুদ আকারভেদে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হতো। কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়ে ভারতীয় হলুদ ১১৮ এবং দেশি হলুদ ১৩০-১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তিন-চার দিনে কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়ে ভারতীয় জিরা ২৮৫ টাকা, আফগান জিরা ৩১৫, ভারতীয় শুকনা মরিচ (মিষ্টি জাত) ১৪৫, শুকনা মরিচ (ঝাল জাত) ১৫৬, দেশি শুকনা মরিচ (শঙ্খ এলাকা) ১৬০-১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি চীনা দারচিনি ৩০৫, ভিয়েতনামের দারচিনি ২৩৫, ভারতীয় লবঙ্গ ৮৫০-৮৬০ ও ব্রাজিলের লবঙ্গ ৯৮০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে এসব পণ্য কেজিতে ১০-১৫ টাকা কমে লেনদেন হয়েছিল।

কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতিকেজি এলাচ ১১শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিকেজি গোল মরিচ এক হাজার ১১০ থেকে এক হাজার ১২০ টাকা, বাদাম ১১০ টাকা ও ধনিয়া ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ভিয়েতনামের দারচিনি ৩৬০ টাকা, শ্রীলঙ্কান লবঙ্গ ১৩শ’ টাকা, ভারতীয় লবঙ্গ ১১শ’ টাকা, ভারতীয় জিরা ৩২০ টাকা, ইরানি জিরা ৩৫০ টাকা, আমেরিকান কাঠ বাদাম ৯৮০ টাকা ও ইরানি পেস্তা বাদাম ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রতি কেজি শ্রীলঙ্কান জাইফল ৮শ’ টাকা, ভারতীয় জাইফল ৭শ’ টাকা, ইরানি কিশমিশ ৩২০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকা, ইন্দোনেশিয়ান গোল মরিচ এক হাজার টাকা, আমেরিকান এলাচ ১৬শ’ টাকা, সাদা গোল মরিচ ২ হাজার ৫০ টাকা,  কালো গোল মরিচ ১ হাজার ৩৭৫ টাকা, আলু বোখারা ৫৮০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ানবাজারের হক মসলা বিতানের মালিক আব্দুস সাত্তার বলেন, গত সপ্তাহের আগে দাম কম ছিল। তখন বেশির ভাগ মসলার দাম কমেছে। শুধু জাফরান ও কালিজিরার দাম বাড়তির দিকে ছিল। এখন প্রায় সব মসলার দামই বেড়েছে।

সওদাগর স্টোরের মালিক লাল শরিফ বলেন, কোরবানির দুই একদিন আগে মসলার বাজারের আসল চেহারা ধরা পড়ে। আমরা ভেবেছিলাম এবার দাম বাড়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। কিন্তু এবার আগেই দাম বেড়ে গেছে।

দাম বৃদ্ধি সম্পর্কে এই দুজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে আমদানিকারকরা মসলাপণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে কয়েক মাস মসলার দাম নিম্নমুখী ছিল।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মসলার মজুদ রয়েছে। তাই ঈদকে সামনে করে দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। পেঁয়াজের দাম একটু বেশি ছিল, সেটাও কমে আসছে।

তিনি বলেন, যেটা বাড়ছে, এর জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা দায়ী। মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হলেই এই অসাধু দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়ে যাবে। শিঘ্রই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানান তিনি।

জেআই