এশিয়ার পোশাক শিল্পে কম মজুরির দেশগুলোর শ্রমিকরা ক্রমাগত মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছে এবং কিছু শীর্ষস্থানীয় বিদেশী পোশাক ব্র্যান্ড জানিয়েছে তারা মজুরি বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে আগ্রহী।

গত সেপ্টেম্বরে হেনস অ্যান্ড মরিজ এবি ও ইন্ডিটেক্সের মতো ইউরোপের শীর্ষ কয়েকটি পোশাক ব্র্যান্ড কম্বোডিয়ার সরকারের কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানায়, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রতিদানে তারা স্থানীয় কারখানার মালিকদের আরো বেশি অর্থ দেয়ায় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে সরকার, ম্যানুফ্যাকচারার ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনায় বিদেশী ক্রেতারা যে তাদের সম্পৃক্ততা আরো বাড়াতে চায়, তা এ বিবৃতির মাধ্যমে আরো জোরদার হলো।

চীনে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্প্রতি বিদেশী ক্রেতারা কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশের মতো সস্তা শ্রমের দেশগুলোর প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু এসব দেশের পোশাক শিল্পে সংঘটিত বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে এ খাতে নিরাপত্তা ও উচ্চ মজুরি নিশ্চিত করতে এসব ক্রেতার ওপর বৈশ্বিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

গত বছর বাংলাদেশে রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দেশটির শ্রমিকদের কর্মনিরাপত্তা বিশ্বব্যাপী প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। ওদিকে জানুয়ারিতে উচ্চ মজুরির দাবিতে কম্বোডিয়ায় বিক্ষোভরত গার্মেন্টস শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে তাতে কমপক্ষে চারজন মারা যায়।

ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে মাসিক ৬৮ ডলারে উন্নীত করে। এখন কম্বোডিয়ার শ্রমিক প্রতিনিধিরা ন্যূনতম মজুরি মাসিক ১০০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০১৫ সালে ১৭৭ ডলারের উন্নীত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে।

কম্বোডিয়ায় ওভারটাইমসহ শ্রমিকরা সাধারণত প্রতি সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করে থাকে। কারখানার মালিকরা বলছেন, কৃষি বা অন্যান্য খাতের তুলনায় এ খাতে শ্রমিকরা এখন বেশি মজুরি পাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মাথাপিছু ১ হাজার ডলার আয় করা কম্বোডিয়া এখনো দরিদ্র দেশের কাতারে রয়ে আছে। দেশটির পোশাক শিল্পে প্রায় ছয় লাখের বেশি শ্রমিক নিয়োজিত আছে, যার অধিকাংশই নারী।

গত সপ্তাহে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হান সেন সতর্ক করে বলেছিলেন, মজুরি বেশি বৃদ্ধি করলে তাতে রফতানিতে ৮০ শতাংশ অবদান রাখা গার্মেন্টস শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে চাই এ ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’

মাসিক ১০০ ডলার জীবন ধারণের জন্য অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কর্তন করায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ন্যূনতম মজুরি থেকেও কম পেয়ে থাকেন।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর কম্বোডিয়ায় উপ-প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক চিঠিতে ক্রয় করা পণ্যের জন্য আরো বেশি অর্থ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইউরোপের ক্রেতাগোষ্ঠীরা সরকারকে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির নীতিমালা অনুসরণ করার আবেদন জানায়। এ চিঠির জবাবে ব্র্যান্ডগুলোর কাছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে বিবেচনা করতে নিয়োগদাতাদের প্রতি এ চিঠি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম সুইডেনের এইচঅ্যান্ডএমের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বাস করে তারা পণ্যের দাম না বাড়িয়েই শ্রমিকদের উচ্চ মজুরিতে সহায়তা করতে পারবে। সেক্ষেত্রে ডিজাইন, সরবরাহসহ অন্যান্য বিভাগে তারা ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেবে।

বেসরকারি সংস্থা সলিডারিটি সেন্টারের কম্বোডিয়া শাখার প্রকল্প পরিচালক ডেভিড ওয়েলশ জানিয়েছেন, শ্রমিক সংগঠনগুলো এখন ইউরোপিয়ানদের মতো একই পদক্ষেপ নিতে মার্কিন ক্রেতাদের প্রতি আর্জি জানাচ্ছে। মার্কিন ব্র্যান্ড গ্যাপ জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ‘শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মজুরি নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে আমরা কম্বোডিয়া সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছি।’ অন্যদিকে লেভি স্ট্রসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি একমত যে নতুন ন্যূনতম মজুরি শ্রমিকদের চাহিদা মেটাবে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

ঢাকা, ১৬ অক্টোবর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর