সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করেছে দেশের ১৫টি শিল্পগোষ্ঠী। এর মধ্যে সাতটি গ্রুপ ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে। বাকি আটটি গ্রুপ আবেদন করেছে ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণ পুনর্গঠনের। তবে ঋণগ্রহণকারী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোই এ আবেদন করেছে।
গত মঙ্গলবার ছিল ঋণ পুনর্গঠন চেয়ে আবেদনের শেষ দিন।
৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনর্গঠন চেয়ে আবেদনকারী গ্রুপগুলো হলো— বেক্সিমকো, যমুনা, শিকদার, থার্মেক্স, কেয়া, এসএ ও এননটেক্স। ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণ পুনর্গঠন চেয়েছে আব্দুল মোনেম, রতনপুর, দেশবন্ধু, গিভেন্সি, নাসা, ইব্রাহীম টেক্সটাইল, বিআর স্পিনিং ও ক্যান-অ্যাম গার্মেন্টস।
১৫ প্রতিষ্ঠানের আবেদনপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক রূপ রতন পাইন।
তিনি বলেন, ‘১৫টি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঋণ পুনর্গঠন চাওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে এসব আবেদন বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে শর্ত মেনে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন না করায় সবার আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, ২০১৪ সালে বেক্সিমকো গ্রুপ প্রথমবারের মতো ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করে। এর পর আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একই দাবি তোলা হয়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদে অনুমোদনসাপেক্ষ ২৯ জানুয়ারি ঋণ পুনর্গঠনে একটি নীতিমালা জারি করা হয়। এতে ৩০ জুন পর্যন্ত আবেদনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা পড়া আবেদনে দেখা গেছে, বেক্সিমকো গ্রুপের ৪,৯৫১ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনে আবেদন করেছে সাত ব্যাংক। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকে ঋণ ১,৮৪৯ কোটি, সোনালীতে ১,০৭৫ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ৪৭৭ কোটি, এবি ব্যাংকে ৪৮৩ কোটি, ব্যাংক এশিয়ায় ৩০ কোটি, এক্সিমে ২৩৩ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকে ঋণ ৮০১ কোটি টাকা।
যমুনা গ্রুপের ১,৪১১ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে নয় ব্যাংক। এর মধ্যে জনতার ৫৯৮ কোটি, ইউসিবিএলের ১৭৪ কোটি, আইএফআইসির ১৪১ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্টের ১৬৪ কোটি, ডাচ্-বাংলার ১৭৫ কোটি, সোস্যাল ইসলামীর ৭৩ কোটি, মার্কেন্টাইলের ৫১ কোটি, অগ্রণীর ৩২ কোটি ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ ৭৮ কোটি টাকা।
থার্মেক্স গ্রুপের ৬৬৬ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে জনতা ব্যাংক। সিকদার গ্রুপের ৬৮৬ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনে আবেদন করেছে এবি ব্যাংক।
এননটেক্স গ্রুপের গ্যালাক্সি সোয়েটারের ১,০৯৪ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে জনতা ব্যাংক।
কেয়া গ্রুপের ৮৭৯ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে পাঁচ ব্যাংক। এর মধ্যে পূবালী ব্যাংকের ঋণ ৪৭৯ কোটি, সাউথইস্টের ৩১০ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ১৪ কোটি, স্ট্যান্ডার্ডের ৪০ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকের ৩৪ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামভিত্তিক এসএ গ্রুপের ৭১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে চার ব্যাংক। এর মধ্যে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ ৫৫ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটির ২৯৮ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ২৫৫ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকের ১০৯ কোটি টাকা।
রতনপুর গ্রুপের ৪৩৫ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে জনতা ব্যাংক। আব্দুল মোনেম গ্রুপের ৪৯৭ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনে আবেদন করেছে চার ব্যাংক। এর মধ্যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ প্রায় ৪৫ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ১১০ কোটি, ইসলামী ব্যাংকের ৩০০ কোটি ও এবি ব্যাংকের প্রায় ৪২ কোটি টাকা।
ইব্রাহীম গ্রুপের ৩৩৮ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনে আবেদন করেছে দুই ব্যাংক। এর মধ্যে আল-আরাফাহ্র প্রায় ১৩০ কোটি ও সোস্যাল ইসলামীর ২১০ কোটি টাকা।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিআর স্পিনিংয়ের ৪৭২ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন চেয়ে আবেদন করেছে জনতা, ব্যাংক এশিয়া, বিডিবিএল ও অগ্রণী ব্যাংক। এর মধ্যে জনতার ঋণ ৩১৩ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ৪৬ কোটি, বিডিবিএলের ৩৫ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ৭৭ কোটি টাকা।
ক্যান-অ্যাম গার্মেন্টসের ১৪ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে ব্যাংক এশিয়া। পাশাপাশি দেশবন্ধু সুগার মিলসের ৫৬ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে ব্যাংক এশিয়া, গিভেন্সি গ্রুপের ৬০ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনে আবেদন করেছে অগ্রণী ব্যাংক এবং নাসা গ্রুপের ২০০ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠন চেয়েছে ইসলামী ব্যাংক।
ঋণ পুনর্গঠনের আবেদনগুলো যাচাইয়ে একটি কমিটি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কমিটির প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী বলেন, আমরা আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে মতামত দিয়ে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে পাঠিয়ে দেব। ওই বিভাগই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোগত সমস্যা ও আন্তর্জাতিক বাজার প্রেক্ষাপটে যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, তাদের ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিতে গত জানুয়ারিতে একটি নীতিমালা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নীতিমালা অনুযায়ী, মেয়াদি ঋণ পুনর্গঠনের মেয়াদ ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ১২ বছর। আর তলবি ও চলমান ঋণের ছয় বছর। সুদহার ধরা হয়েছে ব্যাংকের তহবিল ব্যয়ের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি।
প্রতারণা বা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কোনো ঋণগ্রহীতা পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে না। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা রয়েছে অথবা অন্য কোনো আইনে অন্য কোনো সংস্থায় মামলা আছে, তারাও এ পুনর্গঠন সুবিধা পাবে না।
ইআর





