বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে ভয়ংকর কারসাজিতে মেতেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো। তেল সংকটের দোহাই দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান রহস্যজনকভাবে এক এক করে বন্ধ করে দিচ্ছে উৎপাদন কেন্দ্রগুলো।
এ কারণে বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সরকারের বড় ধরনের সাফল্য থাকলেও দিন দিন তা ম্লান হতে চলেছে। বেসরকারি হিসাবে প্রায় ২৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে প্রতিদিন। যার পুরোটাই লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে জনগণের ভোগান্তি বাড়িয়ে সমন্বয় করা হচ্ছে।
গত ১০ দিন ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে দিনে-রাতে ৬-৭ ঘণ্টা করে লোডশেডিং করা হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামের অবস্থা আরও ভয়াবহ। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অনেক সমিতি আছে, যেখানে দিনে-রাতে ১ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না।
কিন্তু এত বড় বিপর্যয়েও কোনো মাথাব্যথা নেই সংশ্লিষ্ট আইপিপি (ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) মালিকদের। উল্টো তারা এ দুর্বলতাকে পুঁজি করে ফার্নেস অয়েলের মতো এখন শুল্কমুক্ত কোটায় ডিজেল আমদানির অনুমতির জন্য সরকারের ওপর চাপ দিয়ে চলেছে। সরকারের অন্দর মহলের একটি শক্তিশালী মাফিয়া চক্র এই অসাধু বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের মদদ দিচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বছরে ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টনের বেশি ডিজেল আমদানি হচ্ছে দেশে। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চোখ এখন এ ডিজেলের ওপর। তাদের টার্গেট বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে শুল্কমুক্ত কোটায় ডিজেল আমদানির অনুমতি নেয়া। এতে তারা কম দামে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি করে সেটা বাইরে বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে। তাতে একদিকে কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বেশি দামে বিক্রি করে লাভবান হবে।
অপরদিকে ডিজেল আমদানি করেও আঙুল ফুলে কলা গাছ বনে যাবে। হঠাৎ করে এত ব্যাপক লোডশেডিং কেন, এর নেপথ্যে কারও কোনো ধরনের কারসাজি আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে কয়েকটি গেয়েন্দা সংস্থা বিপিসির কাছে বছরে কি পরিমাণ ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি করা হচ্ছে তার তালিকা নিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোও কী পরিমাণ তেল আমদানি করছে সেই তথ্যও নিয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে কী পরিমাণ ফার্নেস অয়েল লাগে- সেটাও তারা খতিয়ে দেখছে। এসব কিছু বিশ্লেষণ করে তারা শিগগিরই সরকারের কাছে রিপোর্ট দেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে তারা বাধ্য হয়ে ফার্নেস অয়েল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো তাদের চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ-তিন গুণ ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে। আর এ তেল কম দামে খোলা বাজারে বিক্রি করছে। এতে বিপিসি ফার্নেস অয়েলে বড় ধরনের মার খাচ্ছে। যার কারণে গত ২-৩ বছর ধরে বিপিসি ফার্নেস অয়েল আমদানি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৪টি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ফার্নেস অয়েল আমদানি করেছিল সাড়ে ৯ লাখ টন। আর সেখানে বিপিসি আমদানি করেছিল মাত্র ৫ লাখ টন। অপরদিকে ২০১৬ সালের ৪ মাসে বিপিসি আমদানি করেছে মাত্র ৬০ হাজার টন। আর সংশ্লিষ্ট আইপিপিগুলো আমদানি করেছিল ৪ লাখ টন।
বিপিসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তার প্রশ্ন- তাহলে এই তেল গেল কোথায়? চার মাসে সব বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ টন ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেখানে ইতিমধ্যে আমদানি করা হয়েছে ৪ লাখ টন। এখান থেকেই স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকরা মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে সেটা বাইরে খোলা বাজারে বিক্রি করছে। এখন তাদের চোখ পড়েছে ডিজেলের ওপর।
বিপিসির ওই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যদি কোনো কারণে সরকার তাদের চাপে ডিজেল আমদানির অনুমতি দেয়, তাহলে আগামী ২ বছরের মধ্যে বিপিসি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে সরকার বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বিদ্যুৎ নিয়ে। কারণ পুরো বিদ্যুৎ সেক্টর তখন তাদের কব্জায় চলে যাবে।
অভিযোগ আছে, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে সরকারের বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার একদিকে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করছে, অপরদিকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছে। সেই বিদ্যুৎ জনগণের কাছে সরকার বিক্রি করছে অর্ধেকেরও কম মূল্যে। এভাবে কেনাবেচার নামে বছরে মোটা অংকের অর্থ গচ্চা দিচ্ছে সরকার। জনগণের পকেট কেটে এ লোকসানের ভার লাঘবের জন্যই সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো (রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল) চালু রাখতে সরকার রাষ্ট্রীয় অর্থ লোকসান দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী লোকজন জড়িত। তাদের খুশি করতেই এসব করা হচ্ছে বলে মনে করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের স্বার্থে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধের ষড়যন্ত্র চলছে। যে কারণে ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ রেন্টালগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে যাচ্ছে সরকার। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সরকার শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। শুল্ক ও ভ্যাটের পাশাপাশি নয় শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জও রেয়াত (সার্ভিস চার্জ) পাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ আছে, তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে না পারায় রাজধানীসহ সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। সামিট পাওয়ারসহ কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতিমধ্যে ডিজেল আমদানিরও অনুমতি চেয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সামিট পাওয়ার ইতিমধ্যে ডিজেলের অভাব দেখিয়ে তাদের মেঘনাঘাটস্থ ৩৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোটাই বন্ধ করে দিয়েছে। সামিটের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে তাদেরকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ করতে হয়েছে। বিপিসির কাছ থেকে তারা চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছে না।
সামিটের হেড অব জনসংযোগ শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম যুগান্তরকে বলেন, মেঘনাঘাটের ৩৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গত ৫ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। গত ২১ এপ্রিল থেকে সারা দেশে নৌ-ধর্মঘট থাকায় বিপিসি তাদের চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল দিতে পারছে না। এ অবস্থায় তারা বাধ্য হয়েছে কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিতে। বিষয়টি তারা পিডিবিকে লিখিতভাবে জানিয়েছে। সামিট সূত্রে জানা গেছে, নৌ-ধর্মঘট কেটে গেলেও এখনও তারা ডিজেল পায়নি বিপিসি থেকে। এ কারণে তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এখনও পুরোদমে চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী ২-১ দিনের মধ্যে তারা সরকারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনে যেতে পারবে।
সামিটের মতো আরও বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী বিদ্যুৎ কেন্দ্রও তেলের সংকট দেখিয়ে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না। একই যুক্তিতে সিদ্ধিরগঞ্জের দেশ এনার্জির ৯৮ মেগাওয়াট ও সিলেটের খান জাহান আলীর ৪০ মেগাওয়াট কেন্দ্র দুটি পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। হরিপুরের ১১০ মেগাওয়াট আইপিপি থেকেও গত কয়েকদিন ধরে ৯৭ মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে উৎপাদন পর্যায়েই রেকর্ড ১৬০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রাহক পর্যায়ে এ লোডশেডিং আড়াই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। ফলে অস্বাভাবিক গরমে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আর ব্যাহত হচ্ছে শিল্পোৎপাদন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নৌ-ধর্মঘটের সুযোগে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত ডিজেল আমদানির অনুমতির দিতে সরকারকে চাপ দিচ্ছে। তাদের মতে, ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারগুলো (আইপিপি) চালানোর নামে বেসরকারি বিদ্যুৎ মালিকরা এতদিন ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে আমদানি করা এই তেল তারা অবৈধভাবে বাইরেও বিক্রি করছে। পাশাপাশি বড় অংকের টাকা বিদেশে পাচার করছে। যার কারণে বিপিসি প্রতিবছর ৮শ’ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এবার ফার্নেসের পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকরা ডিজেল আমদানি করে সরকারের আরও ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হাতিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার ৭৪৪ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ৯ এপ্রিল উৎপাদন হয় ৮ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। তবে নিয়মিত সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা হয় না। যদিও রাতে পিক আওয়ারে চাহিদা ছাড়িয়ে যায় আট হাজার মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং করতে হয় নিয়মিত।
সূত্রমতে, এপ্রিল-মে মাসে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। গত বছরও এপ্রিলজুড়ে গড়ে আট হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তবে এ বছর তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় পরিকল্পিতভাবে কিছু কেন্দ্র বন্ধ রাখা হচ্ছে, যার বড় অংশই বেসরকারি খাতের। যদিও বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বড় অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে সরকার। জ্বালানি সংকট ছাড়াও বেশ কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র কারিগরি সমস্যার যুক্তিতে বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যে ঘোড়াশাল ম্যাক্স, সামিট মদনগঞ্জ, গাংনগর, কাঠপট্টি, সামিট পাওয়ার (ঢাকা) ও আরপিসিএল (গাজীপুর) আংশিক বন্ধ ছিল। একইভাবে আংশিক বন্ধ করে রাখা হচ্ছে চট্টগ্রাম বিভাগের ডরিন (ফেনী), ডরিন (মহীপাল) ও জঙ্গলিয়া (লাকডানাভি), ময়মনসিংহ বিভাগের এনার্জিপ্রাইম, খুলনা বিভাগের ভেঞ্চার, বরিশাল বিভাগের আমনুরা, কাটাখালী (নর্দার্ন), সিরাজগঞ্জ কম্বাইন্ড সাইকেল, এনার্জিপ্রাইম ও সামিট উল্লাপাড়া এবং রাজশাহী বিভাগের আরজেড (ঠাকুরগাঁও)।
জানতে চাইলে পিডিবির পরিচালক জনসংযোগ সাইফুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, নৌ-ধর্মঘটের কারণে এতদিন মূলত বেশ কিছু বিদু্যুৎ কেন্দ্র পুরো মাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারেনি। এ কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। এ ছাড়া গ্যাস সংকটের কারণেও বেশ কিছু দিন ধরে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, ২-১ দিনের মধ্যে লোডশেডিং আর থাকবে না। সূত্র-যুগান্তর।
এমবি





