চলতি বছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটলেও বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ব্যাংকগুলোতে ঋণের চাহিদাও অনেক কমে এসেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না।
তাছাড়া রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংকগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় এখন আর আগের মতো ঋণ বিতরণ করা যাচ্ছে না। এতে ব্যাংকিং খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিছু ব্যাংক অবশ্যই বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিল করে প্রবৃদ্ধি ঠিক রেখেছে।
এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক খাতের তিন ব্যাংকসহ ১৫ ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় খাতের সোনালী ব্যাংকের ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের প্রচলিত ধারায় শূন্য ৬২ শতাংশ ও ইসলামী উইংয়ে ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ইসলামী উইংয়ের ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যমুনা ব্যাংকের ইসলামী উইংয়ের ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১ দশমিক ৭২ শতাংশ, বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ৩০ দশমিক ১৮ শতাংশ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ২৪ দশমিক ৮২ শতাংশ, সিটি ব্যাংক এনএ’র ১৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ, এইচএসবিসি ইসলামী উইংয়ে ২৫ দশমিক ১২ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি (-) ঋণাত্মক হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, নেতিবাচক ঋণ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আমানতেও ৯ ব্যাংক ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে। ১২ জুন-১৪ ভিত্তিতে বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংকের ইসলামী উইংয়ে ৪৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ইসলামী উইংয়ে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ইসলামী উইংয়ে ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ, বিদেশি খাতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ১৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ, এইচএসবিসি ইসলামী উইংয়ে ৭৮ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং আল-ফালাহ ইসলামী উইংয়ে ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি কমেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১২ জুনের তথ্যে ঋণ ও আমানতের অনুপাত (এডিআর) আরও কমে গেছে। বর্তমানে এডিআরের গড় অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৫০ শতাংশ। যা গত বছরের ডিসেম্বরেও ছিল ৭১ দশমিক ২২ শতাংশ। নভেম্বরে ছিল ৭১ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ৭১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এতে করে প্রতিমাসেই আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণ কমে আসছে। যা সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ সময়ে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে আমানত সংগ্রহে ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ঋণ বিতরণে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ১ হাজার ১৭৪ কোটি, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৯৭৬ কোটি, মেঘনা ব্যাংক ৬৬২ কোটি, মিডল্যান্ড ব্যাংক ৫২০ কোটি ৯৭ লাখ, ফারমার্স ব্যাংক ৪৬৪ কোটি, ইউনিয়ন ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার ৬৬২ কোটি, এনআরবি ব্যাংক ৪৬১ কোটি, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ৪৩০ কোটি এবং মধুমতি ব্যাংক ৩৬৬ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে। নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক গতবছরের জুন মাসের তুলনায় চলতি বছরে আশ্চর্যজনকভাবে ৩ হাজার ৫১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক বছর আগেও আমানতের তুলনায় ব্যাংকগুলো বেশি পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে আসছিল। কিন্তু গত বছর জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশে কার্যত বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ নেই। এতে ঋণ বিতরণে ভাটা শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের বেসরকারি খাত। আর ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় অনেক ভুয়া প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থ বের করে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এতে নতুন ঋণ অনুমোদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি বাড়ায় ব্যাংকগুলো সতর্ক হয়েছে। যাতে করে ঋণ বিতরণে ঋণাত্মক ধারা নেমে এসেছে।
ঢাকা, ১ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এমআর





