ধারাবাহিকভাবে দেশে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহ কমায় সরকারের দু:চিন্তা বাড়ছে। আর এর প্রতিফলন ঘটেছে সদ্য পেশকৃত প্রস্তাবিত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে। তাই বাজেটে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে জনশক্তি রফতানি বাড়ানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা ও নতুন শ্রম উইং খোলার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল গঠনের কথাও বলেছেন অর্থমন্ত্রী, যেখানে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে।
গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘গত অর্থবছরের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে চলতি (২০১৩-১৪) অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রবাসী আয় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০১৩ সালে শুধু আমাদের ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রবাসী আয় কমেছে। আমি ধারণা করছি, সৌদি আরবে কর্মরত শ্রমিকদের চাকরি বৈধকরণের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের প্রবাসী আয় কমেছে। জনশক্তি রফতানির চলমান ধারা বিবেচনায় নিয়ে একে গতিশীল করতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’
বাংলাদেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহে প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক ধারা দেখা যায় ২০১৩ সালে। ওই বছর প্রবাসীরা দেশে পাঠান ১৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও ২০১২ সালে পাঠিয়েছিলেন ১৪ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে ২০১৩ সালে প্রবাসী আয় কমে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ। এ ধারাতেই রয়েছে প্রবাসী আয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রবাসীরা ২০০৩ সালে দেশে পাঠান ৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। ২০০৪ সালে তা বেড়ে হয় ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন, ২০০৫ সালে ৪ দশমিক ২৯, ২০০৬ সালে ৫ দশমিক ৪৮, ২০০৭ সালে ৬ দশমিক ৫৬, ২০০৮ সালে ৮ দশমিক ৯৮, ২০০৯ সালে ১০ দশমিক ৭২, ২০১০ সালে ১১ ও ২০১১ সালে ১২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসী আয় আগের ধারায় ফেরাতে সরকারের বেশকিছু উদ্যোগের কথা তার বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রচলিত বাজার সম্প্রসারণ এবং সম্ভাবনাময় বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কূটনৈতিক তত্পরতা ও নতুন শ্রম উইং খোলা হচ্ছে। জনশক্তি রফতানিতে আমরা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে আমাদের বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
এছাড়া আমরা জিটুজি পদ্ধতিতে জনশক্তি রফতানি চালু করেছি। বেসরকারি চ্যানেলে জনশক্তি রফতানি যাতে নিরুত্সাহিত না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, এসব পদক্ষেপের কারণে আগামী অর্থবছরে প্রবাসী আয় স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে। শ্রমিক দক্ষতা উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হবে।’
এদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে গেছে। সরকারও এসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমবাজারে মন্দা ও খোলা বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেশি হওয়ার কারণেও কমেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। পাশাপাশি দেশে ডলারের চাহিদা কমে যাওয়ায় কয়েকটি ব্যাংকও রেমিট্যান্সকে নিরুৎসাহিত করছে।
ধারাবাহিকভাবে কমছে রেমিটেন্স প্রবাহ। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের মে মাসে রেমিটেন্স কমেছে । গত এপ্রিল মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১২৩ কোটি ৫ লাখ ডলার। মে মাসে পাঠিয়েছে ১২০ কোটি ২১ লাখ ডলার। রেমিটেন্স কমেছে দুই কোটি ৮৩ লাখ ডলার। আর চলতি বছরে ১১ মাসে প্রবাসীরা মোট ১ হাজার ২৯২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশে ১ হাজার ২৯২ কোটি ৬৮ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিলো ১ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। সে হিসেবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স কমেছে ৪৭ কোটি ৩২ লাখ ডলার।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে মাসে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিটেন্স এসেছে ৩৭ কোটি ১১ লাখ ডলার, যা এপ্রিল ছিল ৩৯ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, যা আগের মাসে ছিল ১ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৮০ কোটি ১৬ লাখ মার্কিন ডলার। যেখানে এপ্রিল শেষে এসেছিল ৮০ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
আর বিদেশি খাতের ৯টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১ কোটি ৪১ লাখ ডলার, যা মার্চে ছিল এক কোটি ৪৩ লাখ ডলার। এদিকে বিদায়ী বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক হাজার ৩৮৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ মূল্যের রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছেন। যা আগের বছরে ছিল এক হাজার ৪১৮ কোটি ডলার। সে হিসেবে গতবছরে রেমিটেন্স কমেছে ৩৪ কোটি ডলার বা ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জুলাই মাসে ১২৩ কোটি, আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ১০০ কোটি, অক্টোবর মাসে ১২৩ কোটি, নভেম্বর মাসে ১০০ কোটি, ডিসেম্বর মাসে ১২১ কোটি এবং জানুয়ারি মাসে ১২৬ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এর পর মার্চে রেমিটেন্স এসেছে ১২৮ কোটি ডলার।
রেমিট্যান্স কমার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়া, সে দেশগুলোতে বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেসরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রফতানিতে অনীহা, সর্বোপরি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতায় রেমিট্যান্স প্রবাহ নেতিবাচক ধারায় রয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ টাইম নিউজ বিডিকে বলেন, ‘কয়েকটি বিশেষ কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।
দ্বিতীয়ত কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তৃতীয়ত, যে হারে শ্রমিক ফিরে আসছে সেই হারে বিদেশে যাচ্ছে না। এসব কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের চলমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার ধারা অব্যাহত থাকবে, যা অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো ফল বয়ে আনবে না।’
[b]ঢাকা, ৮ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর[/b]